পাঠচক্র: বাঙালির সব আড্ডা শুধু পরচর্চা নয়

পাঠচক্র

 আমি আড্ডা দিতে ভালোবাসি। শুধু আমি কেন, বাঙালিই আড্ডা প্রিয় জাতি। কিন্তু সত্যজিৎ রায় তাঁর আগন্তুক সিনেমায় উৎপল দত্ত মুখ দিয়ে বাঙালির আড্ডা নিয়ে একটা সমালোচনা দেখিয়েছেন। কথাটা আমার ঠিকই মনে হয়েছে, আমাদের আড্ডাগুলো বড় অন্তশারশূণ্য, বড্ড বেশি অন্যের ত্রুটি ভুল নিয়ে আলোচোনা। তাই আড্ডা হিসেবে আমার সবচেয়ে পছন্দের ফরম্যাট হলোপাঠচক্র যেখানে অন্তত কারো হাড়ির খবর নিয়ে আলোচোনার সুযোগ থাকে না। এমনকি কোভিডের সময়ে, ফুল লকডাউনেও আমি ভার্চুয়াল পাঠচক্র চালিয়ে গিয়েছি যা কঠিন সময়ে মানসিকভাবে সুস্থ্য থাকতে খুব সাহায্য করেছিলো।


 যাক সে কথা।

গত দিন পনেরা আগে তেমন‘ই এক পাঠচক্রের খোজ পেলাম জাকারবার্গের মাধ্যমে নাম লেখালাম যাওয়ার  জন্য। কিন্তু বিষয় দেখে মনটা দমে গেলো। কারণ বিষয় ছিলোহুমায়ুন য়াহমেদ এর ছোট গল্প যে ক্ষেত্রে আমার বিচরণ নেই বললেই চলে, তার উপর আলোচক হিসেবে থাকবেন, লেখক মোহাম্মদ আজম, যিনি নিজেকে হু্মায়ুন ব্যাবসায়ী বলে দাবি করেন। তবু ভেবে দেখলাম হাতে সময় আছে  পনেরো  দিন, একটা ডুব মেরেই দেখা যাক। গ্রুপ থেকে রিহার্সাল শেষে প্রায় গেলাম বাতিঘর, খরচ না করে বই পড়ার তীর্থস্থান। ঋদ্ধি বুক ক্যাফে, শাহবাগের পাঠক সমাবেশ সহ বেশ কিছু লাইব্রেরীতে ঘুরলাম, প্রায় মাইকেল ফেল্পস এর মতো গভীর ডুব দেওয়ার চেষ্টা করলাম।


তারপর আসলো সেই আড্ডার দিন, ডুব ভালো দিলেও,পুকুর থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলো। প্রোগ্রামে পৌছাতে দেরি, বাঙালির মহা জরুরি কাজও সময় মতো শুরু হওয়ার রেকর্ড নেই এই ভরসাতে গেলাম, গিয়ে দেখলাম বাংলা একাডেমির পরিচালক কথা বলছেন যিনি হুমায়ুন আহমেদ এর উপর ঢাউস একটা বই লিখেছেন। আরো আছেন কবি সাহিত্যিক, পাঠক, লেখক আফসানা বেগম আছেন আয়োজক হিসেবে। বসলাম।


কথা শুনছি চুপচাপ, ভালোই লাগছে, বাঙালির আড্ডা নিয়ে উৎপল দত্তের কথা মিলছে না এখানে। এক পর্যায়ে ভাবলাম , একটু যখন পড়েছি, কিছু বলি। হুমায়ুন আহমেদ এর সেরা দশ গল্প নামে একটা বই পেয়েছিলাম বাতিঘরে, তার প্রথম গল্প ছিলোসৌরভ” , যেখানে দেখানো হয়েছে বাবা-সন্তানের সম্পর্কের জটিল রসায়ন খুব সহজে।সহজ কথা যায় না বলা সহজেএটা যেন বাবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সত্যি, বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে লেখা ফেসবুক পোস্টে বাবাকেই হাইড করতে হয় আমাদের। বাবাকে কখনো বলা হয় না, বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসি। অল্পই বললাম কারণ পড়াশোনাভ খুব বেশি দিনের না। আরো অনেকেই খুব সুন্দর কথা বললেন, মাঝে মাঝে কেউ ট্র্যাক ফেইল করে ব্যক্তিজীবনে ঢুকে গেলে আয়োজক পক্ষ একটু নাড়া দিলেন। এভাবে প্রায় সাড়ে চারঘন্টার আয়োজন শেষ হলো। শেষদিকে এসে আমি নাস্তায় মনোযোগ দিলাম, পাঠচক্রে নাস্তা পাওয়ার অভিজ্ঞতা আগে নেই বরং নিজেদেরই খরচ করে খেতে হয়। ঢাকা শহরে একা থাকা মানুষের রেডি নাস্তা যে আকাঙ্ক্ষিত বস্তু!!!


পাঠচক্রে বক্তব্য রাখছেন জেসমিন জেবা



যাইহোক খাওয়া শেষে উঠবো আমি। তখন আফসানা ম্যাম বললেন, একটা পর্ব আছে, আজকের চক্রে যে সেরা আলোচক বা পাঠক হয়েছেন তার জন্য আছে একটা পুরষ্কার আর তা হলো সেই হানিফ সংকেতের সুরে মহামূল্যবান বই।


আবার বসে পড়লাম, ভাবলাম, নাস্তা খেয়েই চলে গেলে লোকে আবার কোন একটা এলাকার সাথে যেন তুলনা করে শুনেছি। নাম ঘোষণা হলো। প্রথম- জেসমিন জেবা। যেটা স্বয়ং আমি। একেবারে অস্কার পেয়ে কেট উন্সলেট যেমন বিশ্বাস করতে না পেরে ভুলভাল বলছিলো, আমারও কাছাকাছি অবস্থা হলো, উদ্ভট পোজ দিলাম ছবির কোত্থেকে আমি, এসেছি শুনতে, বলেছি সবচেয়ে কম, জানিও না পু্রষ্কার দেয়। খুশিতে মনটা এমন ভরে গেলো। হাসান আজিজুল হকের বই পেলাম, অনেকের সাথে পরিচয় হলো, কথা হলো, আরো অনেক পাঠচক্রে যুক্ত হওয়ার একরাশ অনুপ্রেরণা নিয়ে ফিরে আসলাম।মনে হলো বাঙালির সব আড্ডায় শুধু পরচর্চা হয় না, সাহিত্য চর্চাও হয়।


লেখা: জেসমিন জেবা


Previous Post Next Post