ধরা যাক আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে নজরুলের মতই রবীন্দ্রনাথ পাঠক সমাজে ব্রাত্য হয়ে পড়লেন। জানি ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক তবে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল আজ থেকে মোটামুটি ৬০০ বছর আগে।
দিল্লির মসনদ তখন তুঘলক শাসনের দুর্বলতায় আক্রান্ত। মোহাম্মদ-বিন-তুঘলকের অপটু প্রশাসনের সুযোগ নিয়ে, রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত বাংলার, সোনারগাঁ-সাতগাঁ-লখনৌতি একত্র করে ' শাহ-এ-বাঙ্গলাহ ' উপাধি নিয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলার ঘোষণা দেন, সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। এমতাবস্থায় পূর্বের অস্থির বাংলা হঠাৎ এক নেতার ছায়ায় একীভূত হওয়ায় জনমনে যে তীব্র শান্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার অনিবার্য প্রভাব দেখা যায় তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে। পূর্বের শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কবিগণ সাহিত্য সাধনা করতেন রাষ্ট্রীয় ভাষায়। যেমন পাল যুগের পালি এবং সেন যুগের সংস্কৃত। দানসাগর এবং অদ্ভুতসাগর তার প্রমাণ। কিন্তু ইলিয়াস শাসনামলে সাহিত্যিকগণ নিজ মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনায় আগ্রহ অনুভব করেন। যার ফলস্বরূপ মোটামুটি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয় বাংলা সাহিত্যের, বাংলা ভাষায় রচিত দ্বিতীয় অন্যতম নিদর্শন বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে প্রথম সংগৃহীত হয় একটি কীর্তন পুঁথি। ১৯০৯ সালে বসন্ত রঞ্জন রায় কর্তৃক আবিষ্কৃত এই পুঁথির গবেষণাকার্য ও অন্যান্য কার্য সমাধা করে,বর্তমান আকারে ছাপাতে ছাপাতে সময়টা এসে দাঁড়ায় ১৯১৬ এ। বসন্তরঞ্জন এর নাম দিলেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। প্রথম সমস্যা তৈরি হয় এইখানেই। কারো কারো মতে এই পুঁথিখানার নাম শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নয় বরং শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। প্রমাণস্বরূপ পাওয়া যায় প্রাচীন পুঁথির মাঝে একটু খন্ডিত পত্র যাতে লেখা ছিল এটি রাজ গ্রন্থাগার হতে একজন ব্যক্তি আশ্বিন মাসে পড়বার উদ্দেশ্যে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। যা তিনি তিন মাস পর ফেরত দিয়ে যান। সেইখানেই গ্রন্থটির নাম লেখা শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। তবে, বসন্তরঞ্জন কেন এই গ্রন্থটির নাম শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ থেকে পরিবর্তন করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন করেছিলেন তার ব্যাখ্যা তাঁর কাছেই রয়ে গেছে। দ্বিতীয় সমস্যাটি তৈরি হয় এর সময়কাল নিয়ে। কেউ কেউ বলেন এই পুঁথিটি আসলে প্রাক চৈতন্য যুগের সাহিত্য নিদর্শন তবে, এর মত বিরোধিতা করে কিছু কিছু গবেষক বলে থাকেন এটি চৈতন্য পরবর্তী যুগের সাহিত্য নিদর্শন। দ্বিতীয় মতটি খুবই ঠুনকো। কারণ চৈতন্য দেব নাকি নীলাচলে অবস্থানকালে চন্ডীদাসের কৃষ্ণ কীর্তন গাইতেন এবং ভুয়সী প্রশংসা করতেন।(চৈতন্যচরিতামৃত) তাই ধরে নেয়া যায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন প্রাক চৈতন্য যুগেরই সাহিত্য নিদর্শন।
অন্যদিকে গবেষণায় দেখা যায়, চৈতন্য পরবর্তী যুগের সাহিত্যে যে দাস্য, সখ্য , বাহুল্য ও মাধুর্য রসের আধিক্য এবং আধ্যাত্মিকতার যে আধিক্য তা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে নেই। এটি আগাগোড়া আদি রসে রচিত কাহিনী কাব্য। এটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ নয় বরং কবি নিজ মনের খেয়ালে তৈরি করেছেন এক লম্পট কৃষ্ণ এবং গোপবধূ রাধার প্রেম কাহিনী। চৈতন্য যুগ ও পরবর্তী সাহিত্যে অর্থাৎ বৈষ্ণব সাহিত্যে রাধা হয়ে ওঠেন এক অনন্য দেবী যার রয়েছে দৈবিক লীলা ও মায়া কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা একজন গৃহবধূ যিনি কৃষ্ণের দ্বারা প্রেমে প্রতারিত হন। তাছাড়া শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কোন বিচ্ছিন্ন পদের সংকলন নয়, পদাবলী সাহিত্য নয়। এটি রচিত হয়েছিল তৎকালীন গ্রাম্য সভায় উপস্থাপিত হওয়ার মতন একটি গীতিনাট্য অথবা কাব্যনাট্য হিসেবে। ফলত বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য পদাবলী নয় কারণ বড়ু চন্ডীদাস নিজেকে বারবার বাসলী দেবীর ভক্ত হিসেবে দাবি করছেন কিন্তু গোটা কাব্য জুড়ে বাসলী দেবীর কোন গুণকীর্তন করা হয়নি। যেহেতু পদাবলী সাহিত্যে দেখা যায় মূলত ইষ্ট দেবতার নানাবিধ গুণকীর্তন করা হয়। তাই এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, বড়ু চন্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আদিরসে পূর্ণ একটি প্রাক চৈতন্য যুগের গীতিকাব্য। যেটি মোট 13 খন্ডে বিভক্ত। যেমন: জন্ম খন্ড, যমুনা খন্ড, দান খন্ড ইত্যাদি।
নিদর্শন হিসেবে একটি পদ, বাংলা অনুবাদ সহ তুলে ধরছি যেখানে রাধার রূপশ্রী কে বর্ণনা করা হচ্ছে।
দান খন্ড, পদ ৭:
নীল জলদ সম কুন্তলভারা।
বেকত বিজুলি শোভে চম্পকমালা।।
কালো মেঘের মতো কেশকলাপ। তাতে চম্পক মালা সদা স্থির বিজলীর মত শোভা পাচ্ছে।
শিশত শোভএ তোর কামসিন্দুর।
প্রভাত সমএ যেন উয়ি গেল সূর।।
তোর সীমন্তে শোভা পাচ্ছে কাম উদ্দীপক সিন্দুর বিন্দু, যেন প্রভাত কালের সূর্য উদিত হ'ল।
ললাটে তিলক যেহ্ন নব শশিকলা।
কুণ্ডলমন্ডিত চারু শ্রবনযুগলা।।
কপালে তিলক যেন নব চন্দ্রকলা, মনোরম কর্ণযূগল কুন্ডলে মন্ডিত।
নাসা তিলফুল তোর আতী আনুপমা।
গন্ডস্থল শোভিত কমলদল সমা।।
তিলফুল সদৃশ তোর নাক অতি অনুপম, পদ্মফুল দলের মতো গন্ডস্থল শোভামান।
নয়নযুগল শোভে যেহেন খঞ্জনে।
ঈষত কটাক্ষে মোহে মুনিমনে।।
চোখ দুটি শোভা পায় খঞ্জন পাখির মত, তার ঈষৎ কটাক্ষে মুনিমন ও মোহিত হয়।
বিম্ফফল জিণী তোর আধরের কলা।
মানিক জিণিআঁ তোর দশন উজলা।।
তোর অধরের কান্তি বিম্বফলকে জয় করে, উজ্জ্বল্যে মানিককেও জয় করে তোর দন্তরাজি।
কন্ঠ কুম্বসম কুচ কোকযুগলা।
বাহু মৃণাল কর রাতা উতপলা।।
কম্বুসম কন্ঠদেশ, চক্রবাক মিথুন স্তন, বাহু যেন মৃণাল, হাত যেন রক্ত উৎপল।
কনকচম্পক সম শোভে কলেবরা।
মাঝা দেখি সিংহ গেলা পর্ব্বতকুহরা।।
কনক চাপার মতো শোভা পায় তোর শরীর, মাজা দেখে সিংহ পর্বত গ্রহরে পালিয়ে গেল।
নাভি গভীর তোরা প্রেয়াগ উপমা।
উরুমুগ রামকদলিতরুসমা।।
তোর গভীর নাভির উপমা হচ্ছে প্রয়াগ, রামকদলী তরুণসম তোর উরুজুগ।
মন্থর গমনে যাসি ভাঁগিবার ডরে।
তা দেখিআঁ বনবাস লৈল করীবরে।।
মাজা ভেঙে যাবে এই ভয়ে মন্থর গমনে যাস, তা দেখে লজ্জায় হাতি বনবাস গ্রহণ করে।
অমরপুরত নাহিঁ হএ হেন রামা।
বিধি কৈল জঙ্গমে কনকপ্রতিমা।।
স্বর্গলোকেও এমন স্ত্রী নেই, বিধাতা এই জীবন জগতে এমন স্বর্ণপ্রতিমা নির্মাণ করলেন।
দেবাসুরেঁ মহোদোধি মথিল তোহ্মারে।
গাইল বড়ু চণ্ডীদাস বাসলীবরে।।
তোমার জন্যই দেবতা ও অসুরগণ মহাসমুদ্র মন্থর করলেন। বাসলির বরে বড়ু চণ্ডীদাস এই গান গাইছেন।
উপরের পদটি পর্যালোচনা করে দেখা যায় এটি আবেগ এবং কাব্য রসে পূর্ণ একটি পদ যেখানে খুব সুন্দর শব্দসমূহের মাধ্যমে রাধার রূপশ্রী কে আবেগীয় ব্যাখায় বিশেষায়িত করা হচ্ছে। বড়ু চন্ডীদাস এইখানে এসেই জিতে যাচ্ছেন। কারণ বাংলা সাহিত্যের যেই দুজন কবিকে আবেগীয় কবি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে তার মধ্যে প্রথম জন বড়ু চন্ডীদাস এবং দ্বিতীয় জন নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ।
এবার একটু বিরহের স্বাদ নেওয়া যাক,
রাধা বিরহ খন্ডের প্রথম পদের খণ্ডাংশ:
আইল চৈত মাস।
কি মোর বসতী আশ।
নিফল যৌবনভারে।।
বিরহে আন্তর জলে।
সুতিঁলোঁ কদমতলে।
আধিক আন্তর মোর পোড়ে।।
চৈত্র মাস এল, নিষ্ফল যৌবন ভার নিয়ে আমার বেঁচে থাকার আশা কোথায়? বিরহে অন্তর জ্বলছে, কদমতলায় গিয়ে শুলাম, তাতে দেখি আমার চিত্ত আরো দগ্ধ হচ্ছে।
হবে না কেন! লম্পট কৃষ্ণ যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কদমতলাতেই আসতো। মনে পড়ে জয়দেবের গীত গোবিন্দর " রতি সুখসারে গতমাভিসারে...." পদটি। পুঁথির একটি অংশে গিয়ে রাধা সকাতরে কাম লোভে নিজ শরীর কৃষ্ণকে বিলিয়ে দিচ্ছেন! পাঠক তার পাঠ সম্পন্ন করে তৃপ্ত না হয়ে পারবেন না। সে সুখ চর্যাপদ পড়েও পাওয়া যাবে না। কারণ ধর্মের আধ্যাত্মিকতার চেয়ে , প্রেম লোকের হৃদয়ের অতি নিকটে। সমগ্র পুঁথিতে চরিত্র মাত্র তিনটি। তাঁরা হলেন, বনমালী অথবা কাহ্ন অর্থাৎ কৃষ্ণ, চন্দ্রাবলি অথবা রাধা এবং সর্বশেষ বড়াই। বলে রাখা ভাল, পুঁথিতে উল্লেখিত কৃষ্ণ এবং রাধার প্রেম যুগল নাকি প্রতিটি মানব মানবীর অসীম প্রেমের প্রতীক।
এইবার আসা যাক বাংলা সাহিত্যের অপর এক সমস্যায়, যাকে বলা হয়ে থাকে চন্ডীদাস সমস্যা। কারণ ঐতিহাসিকভাবে বেশ কয়েকজন চন্ডীদাস কে খেয়াল করা যায়। যেমন বড়ু চন্ডীদাসের কথাই ধরা যাক। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের দুটি অঞ্চল চন্ডীদাস কে নিজেদের কবি হিসেবে দাবি করে থাকে। যেমন বাঁকুড়ার ছাতনা গ্রাম এবং বীরভূমির নান্নুর গ্রাম। এই দুটি গ্রাম বরাবরই চন্ডীদাস কে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। কিন্তু বাস্তবিকভাবে একজন কবির জন্মস্থান তো দুটি হওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের চন্ডীদাস ছাড়াও আরো কিছু বিচ্ছিন্ন পদের কবি হিসেবে চন্ডীদাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। যাদের নামের আগে বিভিন্ন বিশেষণ যুক্ত হচ্ছে যেমন দ্বিজ, দীন, আদি ইত্যাদি। কাব্যিক বিচারে সে সকল পদ গুলোর ভাবধারাও ভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের চন্ডীদাস একজন কবি-প্রতিভা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণীর কবি হলেও বিচ্ছিন্ন পদগুলির চন্ডীদাস কিন্তু অত্যন্ত হীন। তাই গবেষকরা বলছেন আসলে চন্ডীদাস একজন নয় দুজন, তিনজন এমনকি চারজনও হতে পারে। এব্যাপারে ডক্টর শহীদুল্লাহ নিশ্চিত হয়ে বলছেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের চন্ডীদাস সে সকল বিচ্ছিন্ন পদের রচয়িতা চন্ডীদাস থেকে ভিন্ন। অপরদিকে চৈতন্য যুগ পূর্ববর্তী চন্ডীদাসের জনপ্রিয়তা চৈতন্য পরবর্তী যুগে হঠাৎ করে ক্ষয়ে যায়।বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাগণ চন্ডীদাস কে অশ্লীল হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার কাব্য রচনা কে সমাজে ব্রাত্য করে তোলেন। এমন আক্রমণ নতুন নয়। যেখানে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রধান কান্ডারী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু চন্ডীদাসের পদগুলিকে গেয়ে বেড়াতেন সেইখানে বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তারা তাঁকে অশ্লীল বলে আখ্যা দেওয়ায় যে হাস্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন তা বর্তমান সমাজেও প্রাসঙ্গিক। তবে চন্ডীদাস একজন হোক দুজন হোক কিংবা হাজার জন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ভনিতায় বড়ু চণ্ডীদাসের উল্লেখ আছে। অযত্নে অবহেলায় সে পাতাটি নষ্ট হয়ে যায়। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এক ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকের গোয়ালঘরের খসে যাওয়া ছাদে! সে যাই হোক, হুমায়ুন আজাদের একটা কথা বলতেই হয়,
" চন্ডীদাসের কবিতা স্বতস্ফূর্ত কোমল আবেগের প্রকাশ, গীতিময় ও অন্তরঙ্গ। অনেকটা দীর্ঘশ্বাসের মত। চন্ডীদাসের ভাষা সহজ সরল, তাঁর আবেগের মতো নিরাভরণ। তার পদ অরণ্যের নির্জন পুষ্পের মত চিরস্নিগ্ধ, গোপন সুবাস বিলিয়ে চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।"
তথ্যসূত্র:
. আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিত, বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্য
. গোপাল হালদার রচিত, বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা
.মিহির কান্ত রায় রচিত, কাব্বালোচনা: প্রাচীন ও মধ্যযুগ
. হুমায়ুন আজাদ রচিত, লাল - নীল দীপাবলি
.আব্দুল হাই ও আহমদ শরীফ সম্পাদিত মধ্যযুগের গীতিকবিতা

