রূপকথা আর বাস্তবের জাদুকর ছিলেন সেলমা ল্যাগেরলফ। তাইতো বিংশশতাব্দীর অচলায়তন ভেঙে ১৯০৯ সালে তিনি লাভ করেছিলেন নোবেল পুরষ্কার। সাহিত্যে পুরষ্কার বিজয়ী প্রথম নারী হন সেলমা ল্যাগেরলফ। সুইডিশ একাডেমি যখন ঘোষণা করল- এ বছরের নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন একজন নারী, তখন যেন বিশ্বসাহিত্য নড়েচড়ে বসেছিল। সুইডেনের এক স্কুল শিক্ষিকা, যার কলমে উঠে এসেছিল লোকগাঁথা আর কল্পনার অদ্ভুত মিশেল।
১৮৫৮ সালের ২০ নভেম্বর সুইডেনের ভার্মল্যান্ড প্রদেশের ‘মারবাকা’ এস্টেটে সেলমা ল্যাগেরলফ এর জন্ম। ছোটবেলায় হিপ জয়েন্টের এক জটিল অসুখে তাঁর হাঁটাচলা সীমিত হয়ে পড়ে। তবে কি সবই স্থবির হয়ে গেল? উত্তর হলো, না। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাই যেন তাঁকে কল্পনার অসীম জগতের চাবিকাঠি এনে দেয়। অন্য বাচ্চারা যখন বাইরে খেলাধুলায় মত্ত, ছোট্ট সেলমা তখন ডুবে থাকতেন বইয়ের পাতায়। তাঁর ঠাকুমা এবং ন্যানি তাঁকে শোনাতেন নর্ডিক লোককাহিনী, ভূত-প্রেত আর ট্রোলদের গল্প। এই গল্পগুলোই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
কিভাবে একজন স্কুল শিক্ষক হয়ে উঠলেন আজকের সেলমা?
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় মারবাকা এস্টেট বিক্রি করে দিতে হয়। সেলমা তখন স্টকহোমে পড়াশোনা শেষ করে ল্যান্ডসক্রোনাতে এক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মনের ভেতর তখনো ঘুরপাক খাচ্ছে শৈশবের সেই লোকগাঁথাগুলো। শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে তিনি লিখতে শুরু করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয় ‘গ্যোস্তা বেরলিংস সাগা’ (Gösta Berling's Saga)। শুরুতে সমালোচকরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ডেনিশ সমালোচক জর্জ ব্র্যান্ডেসের প্রশংসায় এটি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই উপন্যাসে তিনি তৎকালীন সুইডিশ সাহিত্যের প্রচলিত বাস্তববাদ (Realism) থেকে বেরিয়ে এসে রোমান্টিসিজম এবং কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
এক আশ্চর্য ভ্রমণ:
সেলমা ল্যাগেরলফ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত যে বইটির জন্য, সেটি মূলত লেখা হয়েছিল স্কুলের বাচ্চাদের ভূগোল শেখানোর উদ্দেশ্যে। বইটির নাম ‘দ্য ওয়ান্ডারফুল অ্যাডভেঞ্চার্স অফ নীলস’ (Nils Holgerssons underbara resa genom Sverige)
গল্পে দেখা যায়, এক জাদুকর দুষ্টু ছেলে নীলসকে আঙুলের সমান ছোট করে দেয়। এরপর পোষা রাজহাঁসের পিঠে চড়ে নীলস বের হয় সুইডেন ভ্রমণে। এই রূপক গল্পের আড়ালে সেলমা অত্যন্ত নিপুণভাবে সুইডেনের ভূগোল, প্রকৃতি আর সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন। বইটি আজও শিশুসাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।
নোবেল জয় এবং স্বীকৃতি:
১৯০৯ সালে প্রথম নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান সেলমা ল্যাগেরলফ। নোবেল কমিটি তাঁর সম্মানে বলেছিলেন "তাঁর লেখনীর উচ্চকিত আদর্শবাদ, সজীব কল্পনাশক্তি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হলো।"
১৯১৪ সালে নি সুইডিশ একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন সেলমা ল্যাগেরলফ। এই পদে তিনি ছিলেন প্রথম নারী। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি তাঁর হারানো পৈতৃক ভিটে ‘মারবাকা’ পুনরুদ্ধার করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই সাহিত্য সাধনা করে গেছেন।
সেলমা ল্যাগেরলফ কেবল একজন লেখিকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুইডিশ সংস্কৃতির সংরক্ষক। ১৯৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে তিনি নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা ইহুদি সাহিত্যিক নেলি স্যাকস-কে সুইডেনে আশ্রয় পেতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, কীভাবে মাটির কাছাকাছি থেকেও কল্পনার ডানা মেলে আকাশে ওড়া যায়।
লেখা: তাসফিয়া আজাদ মিথিলা

