"নদীর একটা দর্শন আছে" আমার মত নদী প্রেমিক মানুষের কাছে এই উক্তি সুখ শ্রাব্য। নদী প্রেমিক মানুষেরা জানে, ঠিক কখন, কোন সময় গিয়ে নদীর পাড়ে চুপচাপ বসতে হবে। প্রবাহমান নদীর মৃদুমন্দ স্রোতের সঙ্গে জীবনের ধারাবাহিকতা কিভাবে মিলিয়ে নিতে হবে।কিভাবে খুঁজতে হবে উত্তর।জীবনের বাইরে গিয়েও নদীর যে একটা নিজস্ব দর্শন থাকতে পারে এই ব্যাপারটাই দেখানোর দুঃসাহস করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছেলে, ধীবর তনয় অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
তিতাস একটি নদীর নাম' যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তখন আর বেঁচে ছিলেন না অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তার মৃত্যু হয় তারও বছর পাঁচেক আগে। মাত্র ৩৭ বছরের আয়ু পেয়েছিলেন তিনি। এই ক্ষুদ্র জীবনে তিতাস একটি নদীর নাম বাদেও লিখেছেন 'সাদা হাওয়া' 'রাঙামাটি' নামের আরও ২টি উপন্যাস। যদিও এর কোনোটিই তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনটাই ছিল আদ্যোপান্ত সংগ্রামে পরিপূর্ণ। জন্মেছিলেন তিতাস তীরবর্তী ধীবর সম্প্রদায়ের অতি দরিদ্র এক পরিবারে। শৈশবে হারিয়েছিলেন বাবা-মাকে। ভীষণ মেধাবী হওয়ায় তার পড়াশোনা চলেছিল তিতাস পাড়ের ধীবর সম্প্রদায় অর্থাৎ মালোদের চাঁদা উঠানোর টাকায়। আর বড় হয়ে লিখেছিলেন সেই মালোদের জীবনগাথা
জন্মেছেন ১৯১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি , তৎকালীন কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার গোকর্ণঘাট গ্রামে। তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক। ৩৬ বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনে লিখেছেন মাত্র একটি উপন্যাস। চার খন্ডে মাসিক মোহাম্মদ পত্রিকায় বের করেছিলেন উপন্যাসটি। সেই বিখ্যাত, "তিতাস একটি নদীর নাম"। তিনি শুধু ঔপন্যাসিক নয় সাংবাদিকও ছিলেন। ত্রিপুরা পত্রিকা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু হলেও ,নবযুগ, কৃষক, মাসিক মোহাম্মদী, আজাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন। সম্পাদনা করেছেন মাসিক নবশক্তি পত্রিকার মতন পত্রিকায়। বাংলা সাহিত্যের যতগুলো নদী ভিত্তিক উপন্যাস আছে তার মধ্যে, "তিতাস একটি নদীর নাম" শ্রেয়তর ও গ্রহণযোগ্য উপন্যাস। মাঝি মাল্লার ছেলে হিসেবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিতাস নদী ও তার জনপদের কথা। উপন্যাসের অনন্য নক্ষত্র হলেও দিনদিন তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন নতুন পড়ুয়াদের উইশলিস্ট থেকে। কেন হারিয়ে যাচ্ছেন? হয়তো মানুষের দর্শন বিমুখতা তাকে সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে ঠেলে দিতে চাইছে। সাহিত্যের এই অনন্য ঔপন্যাসিক, সাহিত্যের প্রকৃত রস আস্বাদনকারী ও সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে এখনও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
আমরা অ আ ক খ পরিবার, স্মরণ করছি অদ্বৈত মল্লবর্মণ কে। তার এই অমর সাহিত্য কীর্তি বয়ে চলুক হাজার বছর।
