![]() |
| সাক্ষাৎকার |
অআকখ: আপনার সাথে আমরা কিছুক্ষণ গল্প করব আর গল্পে গল্পে জানতে চাইবো আপনার জীবনের কিছু গল্প। কেমন আছেন?
হরিশংকর জলদাস: হ্যাঁ, ভালোই। ভালো আছি।
অআকখ: ২০২৫ এ এসে বইমেলা কেমন লাগছে?
হরিশংকর জলদাস: আসলে মূল্যায়ন করবার সময় এখনও হয়নি, তবে বইমেলা তো আমাদের মত বুড়ো মানুষদের জন্য সবসময় আকর্ষণীয় হয়। কেন আকর্ষণীয় হয়, সে প্রশ্ন যদি করেন তাহলে বলব, আমাদের দিন শেষ হয়ে আসছে বলেই আনন্দময় জীবনের প্রতি আমাদের. বয়স্ক মানুষদের, টানটা খুব বেশি থাকে। ফলে প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সে বিভোর করা আনন্দের মধ্যে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে। সেজন্য প্রথম থেকেই বইমেলা আকর্ষণীয় লাগে, এবারও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।
অআকখ: আমাদের বাংলা সাহিত্যে একটা কথা খুব প্রচলিত তা হলো: সাহিত্যের একটা রীতি পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতা কেন্দ্রিক এবং অন্যটা বাংলাদেশ তথা ঢাকা কেন্দ্রিক। এই যে সাহিত্য চর্চার দুইটা ভিন্ন কেন্দ্র এইখানে একটা পার্থক্য দেখা যায় এবং পাঠকরাও বলেন যে, কলকাতার সাহিত্য হচ্ছে এক ধরণের, আমাদেরটা এক ধরণের এবং তাদেরটা নাকি বেশি সমৃদ্ধ; সে তুলনায় আমরা একটু পিছিয়ে। আপনার কী মনে হয়?
হরিশংকর জলদাস: আচ্ছা, যদি ধরে নেন যে, নগর জীবন হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে পীঠস্থান, মানুষের জীবনের মহার্গস্থান- তাহলে কলকাতার কথাই সত্য। আবার যদি বলেন যে, নগর জীবনের চেয়েও গ্রাম জীবন অনেক বেশি আকর্ষণীয় তাহলে বাংলাদেশ সত্য।।
কেন?
ব্যাখ্যা করছি। কলকাতার যে সাহিত্য রচিত হচ্ছে, অধিকাংশই কলকাতা কেন্দ্রিক। অথ্যাৎ কলকাতায় তাদের জীবনের অনুষঙ্গগুলোকে নিয়ে, তাদের প্রাপ্তি এবং ক্ষুধা, তাদের পাওয়া না পাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে, নগর জীবনের বিষয়গুলো নিয়ে কলকাতার গল্প, কবিতা উপন্যাসগুলো রচিত হচ্ছে। আর আমাদের দেশে যতই নগরকেন্দ্রিক সাহিত্য উপন্যাস রচিত হোক না কেন সেখানে গ্রামের একটি প্রতিধ্বনি থেকে যায়। ‘৪৭ এর দেশভাগের পরে, ভারতবর্ষ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে পূর্ববঙ্গের সাহিত্য এবং পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের দুটো ধারা স্পষ্ট শোনা গেছে, দেখা গেছে যে ওরা সবসময় একটা নাগরিক জীবন-যাপন করেছে। ঢাকা প্রাচীন শহর, তবে তার চেয়েও বেশি প্রাচীন শহর হচ্ছে কলকাতা। ফলে নগর জীবনের যে দূষণগুলো, নগর জীবনের যে উপর চালাকিগুলো, যদি একটু নগ্ন শব্দ ব্যবহার করে, বাটপারিগুলো ওদের জীবনে বেশি এসছে, যেগুলো আমাদের জীবনে আসতে অনেক সময় লেগেছে। আমরা চুরি করতে শিখেছি সেদিন। আমরা অন্যজনের জীবন থেকে কাহিনি কেড়ে নিতে শিখেছি সেদিন। আমরা এতদিন পর্যন্ত শুধু নিজের কথাই বলেছি, বলবার চেষ্টা করেছি। ফলে এখানকার সাহিত্যগুলো রচিত হয়েছে কাঁচা মাটির সাহিত্য নিয়ে। এখানকার সাহিত্যগুলোর পটভূমি হয়েছে ধানক্ষেত। এখানকার সাহিত্যগুলোর চরিত্র হয়েছে মাঠের চাষী, নদীর জেলে, তারপরে মুচি, মেথর, এগুলো নিয়ে। ফলে এখানে প্রাচীনকালের, মানে আজ থেকে ২০ বছর, ৩০ বছর আগেও আপনি যদি সাহিত্য দেখেন, সেখানে কিন্তু গ্রাম জীবন বারবার আসছে। আপনারা অনেকেই আকবর হোসেনের নাম শুনেছেন কিনা জানি না। আকবর হোসেন বলে একজন খুব বিখ্যাত (আমার কাছে) সাহিত্যিক ছিলেন, যিনি সে সময়ে গ্রামীণ জীবনটাকে উপস্থাপন করেছেন। আমরা যদি ওয়ালীউল্লাহর দিকে তাকাই, সেখানে তো গ্রাম জীবন। আমরা যদি শামসুদ্দিন আবুল কালামের দিকে তাকাই, সেখানে গ্রাম জীবন। আবু ইসহাকের কাছে তাকালেও সেখানে গ্রাম জীবন। গ্রাম নিয়ে যদি অহংকার করবার কোন ব্যাপার থাকে, সেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সাহিত্যিকরাই করতে পারে। নগর জীবনের মধ্যে মেকাপ থাকে খুব বেশি। একজন নগরের নারীকে দেখতে যেমন করে চাকচিক্যময় মনে হয়, কিন্তু তার উপরের খোলসটা মুছে দিলে তার গ্রাম জীবনের চেহারা ফুটে উঠে। আর আমাদের এখানকার সাহিত্য বলুন, মানুষ বলুন, নারীই বলুন- সবগুলোর মধ্যে প্রাণের একটা ছোঁয়া আছে। ওখানে আছে কৃত্রিমতা, আমাদের এখানে আছে প্রাণময়তা। ফলে ওরা যদি সে কৃত্রিমতাকে নিয়ে অহংকার করতে চায় তাহলে আমার বলার কিছু নেই। আর এটা যদি সত্য হয় যে মানুষের জীবনের একেবারে সত্য লগ্নতাই যদি আসল জীবনের ধর্ম হয় এবং সেটা বাংলাদেশের সাহিত্যেই আমরা অনুরিত হতে দেখি- তাহলে সেটা নিয়ে আমাদের তো গর্ব করবার বিষয় হয়ই।
অআকখ: যে আলাপ আপনি করলেন, আমাদের লেখকদের মধ্যে দেখা যায়, কলকাতার সাহিত্য নিয়ে একটা গর্ব-ভাব আছে। বরং বাংলাদেশের সাহিত্য চর্চা নিয়ে তাদের মধ্যে একটু হীনম্মন্যতা কাজ করে। যদি কলকাতা থেকে কোনো একটা বই প্রকাশ হয় তারা তখন ওই বিষয়টাকে মনে করে এক অন্য রকম প্রাপ্তি। এই ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখেন…
হরিশংকর জলদাস: একটা জিনিস ভাই স্বীকার করতেই হবে, আমি অন্তত স্বীকার করি। সেটা হলো বিষয় নির্বাচনে আমাদের দেশের লেখক সাহিত্যিকরা খুব বেশি আগ্রহী না, স্বীকার করি আমি, আপনারা করুন বা না করুন। ওরা ওখানে বহু বিচিত্র বিষয়কে মূল উপজীব্য করে উপন্যাস লিখেছেন, গল্প, কবিতা লিখেছেন। আমাদের লেখার মধ্যে এক ধরণের একঘেয়েমিপনা চলে আসছে। নতুন করে বৈচিত্রময় কিছু লিখবার চেষ্টা করছেন না। যেমন ধরেন, আমাদের দেশে রিকশা নিয়ে কোনো গবেষণা বই কি আপনারা দেখেছেন? আমরা কিন্তু আবহমান কাল ধরে রিকশায় চলছি। গরুর গাড়ি নিয়ে কোনো গ্রন্থ রচনা করতে দেখেছেন? সেই প্রাচীনকাল থেকে গরুর গাড়ির কথা গানে, নাটকে আসছে। আমরা যে প্রতিদিন যে লবণ খাই, লবণ নিয়ে একটি সংখ্যা হতে পারে না? আমাদের দেশে লবণ নিয়ে একটা উপন্যাস হতে পারে না- লবণ মাঠে কাজ করছে তারা? সেরকম লেখাগুলো হচ্ছে না। ওরা করে কি, ওরা জীবনের আশপাশ থেকে বিচিত্র বিষয়গুলো বেছে নেয়। ফলে তাদের নির্বাচনের কাছে নতুনত্ব দেখা যায়। আমাদের মধ্যেও সেরকম একটা নতুনত্ব হচ্ছে না, এমন না। কিন্তু আরো বেশি নতুনত্ব আনা দরকার। আমরা একটা উপন্যাস খুললেই শুধু প্রেমের কথা শুনি। গাছতলায় কে কার জন্য অপেক্ষা করছে। কেমন? ইদানিং ব্রেকআপ বলে একটা শব্দ আমরা শুনতে পাচ্ছি। কার কার সাথে ব্রেকআপ হচ্ছে এগুলো নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু আমরা বলছি না তার কথা যে আমাদের প্রধান খাদ্য সরবরাহ করে। আপনাদের জিজ্ঞস করলে আপনারা অতি অবশ্যই বলবেন যে, আমাদের প্রধান খাদ্য মাছ এবং ভাত। কিন্তু গালি দেওয়ার সময় আমরা তাদেরকেই দেই। কেউ যদি একটু অসভ্যতা করে তাহলে বলত, তুমি কি হাইল্লার পোলা নাকি, যে এরকম অসভ্য ব্যবহার করছো? আর জেলেদের নিয়ে তো অফুরান গালিগালাজ। আমরা ভাবি না, যারা আমাদেরকে বেঁচে থাকার প্রধান অনুষঙ্গটা দেয়, এই আপনার জুতোটা যে সেলাই করে দিচ্ছে ; আজকাল বিষ্ঠা কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হয় না। কিন্তু আজ থেকে ৩০ বছর আগে এই বাংলাদেশে বাড়ির পেছন থেকে হরিজনরা মানে মেথররা বিষ্ঠা কাঁধে করে নিয়ে যেত। তাদের দেখলে আমরা দশ হাত দূরে থাকি। এখনো ওর জাত পরিচয় পেলে চা-দোকানে ওকে খেতে দেয় না। ভিক্ষুকদের নিয়ে আমরা কখনো ভেবেছি যে একজন ভিক্ষুককে নিয়ে একটা গল্প হতে পারে, উপন্যাস হতে পারে? যে রিকশা চালায়, ১০টাকা বেশি চাইলেই আমরা তার গালে চড় মারি। কিন্তু আমরা কখনো ভেবে দেখি না যে, আমাদের হাতে কোমল যে চামড়াগুলো আছে, ওদের হাতের চামড়াগুলো শক্ত হয়ে গেছে। সূঁচ ফুটিয়ে দিলেও সে চামড়াগুলোতে সূচ যায় না। এইসব মানুষদের জীবনের কথাগুলো আমাদের উপন্যাসে আসা উচিত। আমরা শুধু ব্রেকআপের কথা বলি। ব্রেকআপের পরবর্তী কালে যে একটা সংযোজনের বিষয় আছে, অর্থাত, মানুষের জীবনে শুধু ক্ষয়ের কথা বললে তো হবে না, নির্মাণের কথাটাও বলতে হবে। সে নির্মাণের কথাটা আমাদের এখানে হচ্ছে না। আর সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার, সেটা হলো (আমি সহ বলছি) যে, আমরা পড়তে চাই না। আমি পড়তে চাই না। উপন্যাস লিখি। আমি পড়তে চাই না। কবিতা লিখি। আমি জীবনের অভিজ্ঞানগুলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সংগ্রহ করি না। কিন্তু একজন শ্রেষ্ঠ লেখক হতে চাই, পুরস্কার পেতে চাই। এটাই আমাদের দুর্বলতা।
অআকখ: আপনি সাধারণ মানুষের কথা বললেন, সাধারণ মানুষ নিয়ে লেখার কথা বললেন, পাঠের ক্ষেত্রে কি সাধারণ মানুষের পাঠের আবশ্যকতা আছে? কৃষক, শ্রমিক, মেথর, জেলে- তাদের সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
হরিশংকর জলদাস: আমার ব্যক্তিগত আক্ষেপ নিয়েই আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। সংক্ষেপে উত্তর দিলে ওরা তো পড়ে না। পড়বে না। আমি যাদের নিয়ে লিখছি, তারা পড়ে না। যেমন আমি হরিজনদের নিয়ে লিখেছি, মানে মেথরদের নিয়ে লিখেছি। আমি জেলেদের নিয়ে লিখেছি। আমি দেহজীবিনী যারা কম্বি নামের একটা উপন্যাস লিখেছি। আমি রমনা পার্কের এক ভিক্ষুককে নিয়ে রঙ্গশালা বলে এক উপন্যাস লিখেছি। তারা কিন্তু আমার উপন্যাস পড়ে না। তো আমি দুঃখ করে মাঝেমধ্যে বলি, আমি যাদের জন্য লিখি তারা কিন্তু আমার লেখা পড়ে না। আমার লেখা পড়ে যারা পড়ার নয়, তারা। এরা তো যেমন ধরেন, একজন জেলে সেই উদয়াস্তিত কী করে দুটো দু বেলা ভাত জোগাড় করবে, একজন মুচি যে প্রতিদিন জুতো সেলাই করে কিছু আয় করতে না পারলে তার ঘর ভাড়া দিতে পারবে না, ছেলে সন্তানকে ভাত খাওয়াতে পারবে না, সে কী করে বই পড়বে? তবে ব্যতিক্রম যে নেই এমনটাও না। আমি দেখেছি, চট্টগ্রামের একটা অঞ্চলে যে … সেলাই, তার কাস্টোমার যখন থাকে না ওই তার বক্স থেকে বই নিয়ে বই বের করে আমি পড়তে দেখেছি। এই বিষয়গুলো হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটাই, আমি প্রেমের উপন্যাস লিখি না। তাহলে প্রেমিক বা প্রেমিকা পাঠক পেয়ে যেতাম। অন্তত একজন প্রেমিকা আমার বই পড়ত। তো যারা পড়ে তারা দয়া করে পড়ে বোধ হয় আমাকে নিয়ে।
অআকখ: আপনার তো পৌরানিক বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে উপন্যাস আছে। পৌরাণিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে পুরাণের যে উপাদানগুলো আর লেখকের কল্পনা, এই দুটোর মিশেলটা কীভাবে করেন?
হরিশংকর জলদাস: আপনি ঠিকই বলেছেন। পৌরানিক উপন্যাস আসলে লেখার প্রয়োজনই নেই, মূলত যদি সেই সময়ের কাহিনিটাই আপনি হুবহু লেখেন। তাহলে তো মহাভারত পড়লেই হয়ে যায়, রামায়ণ পড়লেই হয়ে যায়। আপনি রাম সম্পর্কে জানতে চাইছেন, সীতা সম্পর্কে জানতে চাইছেন বা দুরযোধন সম্পর্কে জানতে চাইছেন, তাহলে তো ওইসব পড়লেই হয়ে যায়। তাহলে উপন্যাসটা কেন লেখা হচ্ছে বা আমি কেন লিখছি? আমি লিখছি কারণ সেই পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে আমি বর্তমানকে খোঁজার চেষ্টা করছি- বর্তমানের মানুষের জীবনের সাথে সেই পৌরানিক চরিত্রগুলোর মিল বা গড়মিল আছে কি না। আর পৌরাণিক উপন্যাসগুলোয় আমি এমন এমন চরিত্র বেছে নিচ্ছি যারা ওই রামায়ণে এবং মহাভারতে অবহেলিত। যেমন একলব্য, দুরযোধন, কর্ণ। কর্ণকে কখনো আসল মরযাদা দেওয়া হয়নি। কর্ণ কিন্তু অর্জুনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ছিল। তার মরযাদা দেওয়া হয়নি। দুরযোধনকে সবসময় প্রতিনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু তাকে যথার্থ মর্যদা দেওয়া হয়নি। আমি সেখানেও বেছে নিয়েছি। যারা সেখানে লাথিচড় খেয়েছে, যারা সেখানে সেই সময়ে বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্য সমাজ ব্যবস্থা দ্বারা লাঞ্ছিত, অবহেলিত হয়েছে, তাদের নিয়ে লিখবার চেষ্টা করেছি। এখন যাদেরকে নিয়ে লিখছি, বা লিখেছি আমি তারাও সমাজে লাথি চড় খায়।
অআকখ: আরেকটা বিষয় জানার ছিল। আপনারা যখন সাহিত্য চর্চা শুরু করেছেন আর কি, সেই সময় আর বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের যারা সাহিত্য চর্চা করছে এদের ভিতরের বিষয় নির্বাচন বা লেখালেখির ভিতরে যে পরিবর্তনটা আপনি কীভাবে দেখেন?
হরিশংকর জলদাস: পরিবর্তন হবে, পরিবর্তন আছে। আপনি যদি যুগকে ধরতে চান, সময়টাকে যদি ধরতে চান, তো পরিবর্তন হবেই। যেমন আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যে সমাজ ব্যবস্থা ছিল, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল, ব্যক্তিজীবনের চাহিদা ছিল, সেটা তো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে যুগ নিয়েই আপনি লিখুন, সেই যুগটা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যেন বিশ্বস্ত হয়। যেন আপনি বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারেন। একজন চরিত্র এই সরোবরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে- সেটা যেমন অবিশ্বাস্য, ঠিক এমন এমন সময়কে বেছে নেওয়া উচিৎ, এমন এমন বিষয়কে বেছে নেওয়া উচিৎ যেখানে বাস্তব জীবনের অণুরনন আমরা দেখতে পাবো।
অআকখ: তরুণ লেখকদের ক্ষেত্রে আমরা একটা অভিযোগ শুনি- আপনারা প্রবীণ যারা লেখালেখি করেন তরুণদের লেখা পড়তে চান না। তরুণ লেখকরা এ কথা বলেন যে, প্রবীণ লেখকরা তাদের লেখা পড়তে চান না।
হরিশংকর জলদাস: আবার তরুণরা এমন কথা বলেন যে প্রবীণরা যা লিখেছে সবগুলো বস্তাপচা। আমাকে আমার বিভাগীয় প্রধান আমি যখন গভর্নমেন্ট কলেজে পড়াচ্ছি, আমাকে জাইল্লার পোলা বলে ডাকত। এই বেদনা থেকে কিন্তু আমি আসলে ওই নিম্নবর্গীয় মানুষদের সম্পর্কে লিখতে চেষ্টা করেছি। আর আমার সমাজের প্রতি একটা ঋণ আছে। আমি যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি, তাদের কথা বলতে কেউ নাই বলেই হয়তো আমি লেখার চেষ্টা করেছি। হয়তো যতদিন লিখব ততদিনই আমি তোমাদেরই লোক এই কথাটা বলতে হবে।
অআকখ: আপনার লেখালেখির মাধ্যমে যাদের কথা উঠে এসেছে, এখন কি সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখতে পান ?
হরিশংকর জলদাস: ওরা তো আমার বই পড়ে না। বরং বই পড়ে কেউ কেউ আমাকে অনুকম্পা দেখায়, যারা সমাজ পরিবর্তনকার। আমার জলপুত্র উপন্যাসটা নিয়ে দুইবার কি তিনবার জমা দেয়া হয়েছিল সরকারি পর্যায়ের অনুদানের জায়গায়। যিনি প্রধান ছিলেন সেই মন্ত্রণালয়ের তিনি চট্টগ্রামের লোক ছিলেন। তার কাছে গিয়ে এপ্রোচ করা হয়েছে যে হরিশংকর জলদাস, চট্টগ্রামের লোক। তার এই জলপুত্র উপন্যাসটা ক্ল্যাসিকাল। আপনি যদি অনুদান দেন। স্বস্তিতে এবং অস্বস্তিতে যে আপনাকে সঙ্গ দিবে তার নাম বই। পাঠক লেখক নির্বিশেষে সবার কাছে আমার অনুরোধটুকু রইল, পড়বেন, যার যা পছন্দ।
শ্রুতি লিখন : মৌরি হক দোলা
