বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক সমাজ নির্মাণের জন্য কি কি দরকার? টাকা-পয়সা কিংবা আধুনিক নির্মাণ সামগ্রী অথবা বড় বড় বিজ্ঞানী কিছুই দরকারী নয় ইলিয়টের কাছে। তিনি চেয়েছিলেন মাত্র তিনটি জিনিস: Datta, Dayadhvam, Damyata. এগুলো সব মিথোলজির শব্দ। বাংলায় অর্থে করলে দাঁড়ায় উদারতা, সহানুভূতি এবং সংযম। বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক সমাজের সমস্যার প্রতিচ্ছবি এবং সমস্যাত্তোর উন্নত সম্ভাবনাময় পৃথিবী রচনার চ্যালেঞ্জে নিয়ে রচিত T. S. Eliot এর “The waste Land” (দ্যা অয়েস্ট ল্যান্ড) কবিতাটি। সাহিত্য বিবেচনায় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। কবিতায় রয়েছে বিচ্ছিন্নতা, যান্ত্রিকতা ও অসাড়তায় পূর্ণ আধুনিক জীবনের প্রতিফলন এবং নব আত্মিক পুনর্জীবনের আকুতি। যেখানে কবিতাটির শুরু হয় আয়রনিক বাস্তবতা, “April is the cruellest month...” (এপ্রিল হল নিষ্ঠুরতম মাস..) এবং শেষ হয় “Santih shantih santih” (শান্তি শান্তি শান্তি) _শান্তির বহতা দিয়ে।
“দ্যা অয়েস্ট ল্যান্ড” কবিতাটি পাঁচটি পর্বে রচিত। প্রথম পর্বটির নাম দেয়া হয়েছে দ্যা বারিয়াল অব দ্যা ডেড”(The burial of the dead). প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ প্রতক্ষ্য করল যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মৃত্যু। ইউরোপ যেন ধংসস্তুপের ক্ষেত্রভূমি। কবিতায় যুদ্ধের বীর রস রূপান্তরিত হল করুন আর বিভৎস্য রসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকায় এপ্রিল হারাল তার গৌরব। সবচেয়ে সুন্দর এপ্রিলের নাম এখন “নিষ্ঠুরতম মাস”। অনুর্বর, উষর পৃথিবীতে মৃত আত্মাদের বর্ণনা যেন কিছু ভগ্ন ছূর্ন প্রতিবিম্বের স্তুপ। পুরোনো স্মৃতিরা এসে ভগ্ন হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। তবে এই হতাশা, নিরাশা, উষরতা, বিচ্ছিন্নতার মাঝে লাইলাক হল জীবনের প্রতীক, মৃতের মাঝে জীবনের আবির্ভাব।
কবিতাটির ২য় পর্ব “আ গেম অব চেস” ( A game of Chess)। এ পর্বে কবি ফুটিয়ে তোলেন অতি আধুনিক সুসজ্জিত কক্ষের বর্ণনা। যেখানে রয়েছে বিলাসী, বহুমুল্য প্রাচুর্যের সাথে ঐতিহ্যের আড়ম্বরপূর্ণ। রূপক বর্ণনায় উঠে এসেছে আধুনিক সমাজের স্থুল যৌনাচার, নৈতিকতাবিবর্জিত এবং আত্মবিবর্জিত অসাড় অর্থহীন জীবনের গল্প।৷ তাই আধুনিক সমাজে প্রয়োজন আত্মার পুর্জীবন। কবিতাটির ৩য় পর্ব “দ্যা ফায়ার সারমন” ( The Fire Sermon) টেমস নদীর আখ্যান দিয়ে শুরু হয় গল্প। যেখানে নেই প্রাণোচ্ছাস, শুধুই টিকে আছে দূষিত পাপ। চর বয়ে চলেছে একাকী নদীর ধংসাবশেষ। দেহ সর্বস্ব যৌনতা যার রূপকে সেন্ট অগাস্টিনের বর্ণনায় কার্থেজে অপবিত্র প্রেমের পাপচার। তবে ৩য় পর্বের শেষ লাইনে এই পাপাচার এবং অবাস্তব শহর থেকে মুক্তির আকুলতা রয়েছে।
কবিতাটির ৪র্থ এবং সংক্ষিপ্ততম পর্ব “ডেথ বাই ওয়াটার” (Death by Water)। ফিনিসীয় যুবকের রূপক আধুনিক পুজিবাদী সমাজের প্রতীক যেখানে রয়েছে। রয়েছে পুঁজির অস্থির প্রতিযোগিতা। যে উন্মত্ত লালসায় সমুদ্রের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে ফ্লীবাস। এখানে ফ্লীবাসের মৃত্যুর মাঝে রয়েছে লালসাকে জয় করে নতুন জীবন গড়ার বার্তা।
আধুনিক সমাজের জন্যে উপদেশ রয়েছে সেখানে:
“O you who turn the wheel and look to
windward,
Consider Phlebas, who was once
handsome and tall as you.”
(“যেই হও তুমি, ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে চাও!
পরিবর্তনের হাওয়ায় – তাকাও
ফ্লীবাস কে দেখো, সুদেহী সুদর্শন
ছিল সে তোমারি মত ঠিক।”
(অনুবাদ -মারুফ মাহমুদ)
কবিতাটির ৫ম পর্ব “হোয়াট দ্যা থান্ডার সেইড” (What the thunder said)। শেষ পর্ব যা মূলত আধুনিকতার বিচ্ছন্নতা, নিরাশা, হতাশার মাঝেও নতুন উদ্দ্যোমে শান্তির বার্তা দেয় আমাদের। ইউরোপের ধ্বংসাবশেষ এর মাঝে শান্তির বাণী খুঁজতে সমন্বয় করা হয় পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের। খ্রীস্টের জন্মের সময় বজ্রের ধ্বনির কিংবদন্তি এবং ভারতীয় পুরাণে বজ্রের বাণী _ “দাত্তা, দয়াদভম ও দম্যতা”।
তৃষ্ণার্ত রুক্ষ উষর পৃথিবীতে তৃষ্ণায় হাহাকার মানবের আত্মিক মুক্তির কামনায় নির্মোহ লাভের আকাঙ্খাকে ব্যক্ত করেন কবি। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মিলনে প্রাচ্যের শান্তির বহতাকে স্বাগত জানানো হয়_
“Santih shantih santih”
_ (“শান্তি শান্তি শান্তি”)
যা নবজীবনের আত্মিক নবজাগরণে নতুন করে শান্তির বার্তাকে আহবান করা হয়।
রিভিউ: কানিজ ফাতেমা
