পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগার

 

উন্মুক্ত পাঠাগার


একটা সময় ছিলো যখন গ্রামে গঞ্জে পাঠাগার ছিলো, সকাল সন্ধা মুরুব্বিরা গিয়ে পত্রিকা পড়তো, ছেলেরা গিয়ে বই পড়তো, মেয়েরা গিয়ে বই ধার করে আনতো আর বছর শেষে হতো সাংস্কৃতিক সন্ধা অনুষ্ঠান। সেই দিন এখন ফুরিয়েছে। পাঠাগার গ্রাম থেকে হারিয়েছে, রাষ্ট্র সেসবের প্রয়োজনও বোধ করে না হয়তো। কিন্তু সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা এসবের প্রয়োজন বোধ করে, এগিয়ে আসে কাছে। তেমনি একটা কাজ স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগার।


ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নে একদল তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আবিষ্কার করলেন তাদের অভাবগুলো। অভাব ভাতের নয়, কাপড় কিংবা টাকার নয়; জ্ঞানের/বিজ্ঞানের। মস্তিষ্কের তাড়ণায় পরিবর্তনের ভাবনা থেকে স্কুল, কলেজ কিংবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয় বই। পাঠে উৎসাহী করতে 'ভ্রাম্যমান ভ্যানের' মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় বই। মাত্র ১২ টি বই নিয়ে যাদের যাত্রা তাদের সংগ্রহে এখন ২ হাজার বই। প্রথমে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে দিনভর ভেনগাড়ী ঠেলে বই নিয়ে যেতো এই স্বপ্নবিলাসীরা। 



পরবর্তীতে ‘স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগার’ স্থাপন করে তাদের ভিত্তি স্থাপন করে। পাঠাগার উন্মুক্ত থাকে সব বয়সী পাঠকের জন্য । জাতীয় দৈনিক, ষান্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা সংগ্রহে থাকে এই পাঠাগারের টেবিলে। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়! এর সমগ্রটাই পরিচালিত হয়েছে তরুণদের মাসিক চাঁদার মাধ্যমে । একক কারো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়াই এই স্বপ্নস্বারথীরা জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষকে সচেতন করতে বৃক্ষরোপন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে বছরে কয়েকবার করে। নিষিদ্ধ বিদেশী আগ্রাসী মেহগনি, ইউক্যালিপটাস না লাগানোর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে হাটে-বাজারে, স্কুলে। 


প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠে উৎসাহী করতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে। যার ফলশ্রতিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ব্যাপক আগ্রহী হয়ে ওঠে বই পড়ায়। দলবেধে ঘটা করে বই নিতে আসে পাঠাগারে। বাড়িতে বই নিয়ে পড়ার সুযোগ থাকায় আরো বেশি আকৃষ্ট হয়। যারা এক সময় ক্ষুদে পাঠক ছিলো স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগারের; তাদের অনেকেই আজ সরকারী মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে। আনন্দের বিষয় হলো এদের প্রায় প্রত্যেকেই স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক এবং তারাই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে।


মেধা বিকাশে, চিন্তার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখার জন্য স্বপ্নবিলাস যে দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নিয়েছিলো; তা আজ সফল ও স্বার্থক। মাত্র কয়েকজন স্বপ্নচারীর চোখে দেখা পরিবর্তন আজ ২০২৫ এ এসে মানুষের চোখে ধরা দিচ্ছে।



গ্রাম বাংলার কৃষ্টি-কালচার, সাহিত্য সংরক্ষণে প্রারম্ভিক লগ্ন থেকেই পালন করে আসছে গ্রামীন মেলা ‘পৌসালী পাঠোৎসব’। গ্রামীন সংস্কৃতির ধারক এই গ্রাম্য মেলার সাথে 'পাঠ' শব্দটিকে জুড়ে দিয়ে এক নান্দনিক অবয়ব দিয়েছে এই স্বপ্নস্বারথীরা। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের দ্বারা আবৃত্তি, গান, নৃত্য, চিত্রাংকন, নাটিকা সহ নানা বিষয় মঞ্চায়নের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয় এই প্রতি বছর দুদিন ব্যাপী এই পৌষালী পাঠোৎসবে। পুরো বছর পাঠকের পঠিত বিষয়ের আলোকে বর্ষসেরা পাঠকের জন্য পুরষ্কারের ব্যবস্থা রাখা হয় এই শীতকালীন উৎসবে।


পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে এই ‘পৌষালী পাঠোৎসব’ যা অত্র এলাকায় একটা কালচারে রূপ নিয়েছে।  গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এই গ্রামীণ স্বয়ংসম্পূর্ণ মেলা দারুণ এক ক্ষুধার জন্ম দিয়েছে। যে’ ক্ষুধা শিল্পের, যে’ ক্ষুধা সংস্কৃতির, যে’ ক্ষুধা পাঠের; বই পড়ার। যেখান সমাবেশ ঘটে দেশের খ্যতিমান অধ্যাপক, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, কবি, বৃক্ষপ্রেমি কিংবা কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়া শিক্ষকদের।


দশ বছর আগেও দু’তিন গ্রাম খুঁজেও একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া খুঁজে পাওয়া যেতোনা। আর এখন প্রতিবছর 'উচ্চ শিক্ষা বিষয়ক সেমিনার' আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া ও অনুপ্রেরণার গল্প শোনানোর আয়োজন করে। যেখান থেকে ছেলে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে পোষণ করছে, পাচ্ছে সহযোগিতা। 


মেয়েদের স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধে  সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে এবং  বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওঠোন বৈঠকের মাধ্যমে মহিলাদের মাঝে ক্যাম্পিং করে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বর্ণনায় সচেতনতা মূলক নাটিকা/প্রজেক্টরে শর্ট ফিল্ম উপস্থাপন সহ বিচিত্র কর্মকার্ড নিয়ে পড়ে থাকে এই ‘স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগার’। 




তারুণ্যের এই তাড়ণা গ্রাম থেকে গ্রামে, পথ থেকে পথে ছড়িয়ে দেবার যে গুরুদায়িত্ব ‘স্বপ্নবিলাস উন্মুক্ত পাঠাগার’ গ্রহণ করেছে এর রেশ মস্তিষ্কের রেখায় দাগ কেটে যাচ্ছে নিরন্তর । দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে স্বপ্নবিলাস যে পদাঙ্কের সূচনা করলো তা সমাজ পরিবর্তনে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রেখে যাচ্ছে; এমনটাই মনে করেন অত্র এলাকার শিক্ষাণুরাগী ও সচেতন মহল।


পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই কাজের আরো বিস্তার ঘটবে বলে আশাকরি।



লেখা: মৃদুল হাসান, ময়মনসিংহ

Previous Post Next Post