পদ্মা পাড়ের হীরালাল: উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা

 



১৮৯৭ সাল। কলকাতার রাজপথে এগিয়ে চলেছে ঘোড়ায় টানা গাড়ি। গাড়ি থেকে ছড়ানো হচ্ছে হ্যান্ডবিল, তাতে লেখা, ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!


আসুন!

দেখুন! 


যাহা কেহ কখনও কল্পনাও করেন নাই, তাহাই সম্ভব হইয়াছে। ছবির মানুষেরা জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে…।


বঙ্গ দেশে এই জিনিস সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন এক বঙ্গ সন্তান। মায়ের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে তিনি কিনেছিলেন ক্যামেরার যন্ত্রপাতি। তাই দিয়ে তিনি অষ্টম আশ্চর্য বানিয়েছিলেন।


মানিকগঞ্জের বকজুড়ি গ্রামে জন্ম নেয়া হীরালাল সেন উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলচ্চিত্র জগতের এই মহানায়ককে নিয়ে খুব বেশি চর্চা নেই: না সাহিত্যে, না চলচিত্রে। খুব বেশি তথ্যও পাওয়া যায় না হীরালালের শৈশব সম্পর্কে। কিভাবে তার মাথায় চলচ্চিত্রের নেশা চাপলো আর কিভাবেই তিনি হলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তবে আমরা যখন দীনেশচন্দ্র সেনের আত্মজীবনী ‘ঘরের কথা ও যুগ-সাহিত্য’ গ্রন্থ  পড়বো তখন অল্প কিছু জানতে পারবো হীরালাল সম্পর্কে। 


দীনেশচন্দ্র সেনের ছেলেবেলার বেশির ভাগ সময় কেটেছে মানিকগঞ্জে, মামার বাড়িতে। হীরালালের ছোট পিসি রূপলতা সেনের ছেলে দীনেশচন্দ্র সেন। হীরালাল বয়সে দীনেশচন্দ্রের দুই বছরের ছোট। মানিকগঞ্জের বগজুরী গ্রামে তারা একসঙ্গে বড় হয়েছেন। হীরালাল নিজের সম্পর্কে কোথাও লিখে যাননি। কিন্তু দীনেশচন্দ্র তার আত্মজীবনীটা লিখে রাখায় হীরালালের শৈশবটাও খুঁজে পাওয়া যায়। দীনেশচন্দ্রের লেখা থেকে জানা যায়, হীরালাল শৈশবেই ফটোগ্রাফির নেশায় পড়েন। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলার চলচ্চিত্র সর্বপ্রথম তার হাত ধরেই এক ধ্রুব আসনে অধিষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন তার সময় থেকে আগানো এক মানুষ।


তবে কি তিনি পদ্মা পাড়ের সন্তান বলে উপমহাদেশে তাঁর কোন মুল্যায়ন নাই। তখনকার রাজধানী কলকাতায় গিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন বলেই হয়ত বাংলাদেশেও তাঁকে সেভাবে মুল্যায়ন করা হয়না। না বাংলাদেশ, না ভারত কোথাও তাকে নিয়ে খুব বেশি কথা হয় না। যে হীরালাল সেন স্বদেশী আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে ছবি বানাবার পর, বৃটিশ সরকার উপমহাদেশে চলচ্চিত্র সেন্সর আইন প্রনয়নে উদ্যোগী হয়, যা ১৯১৮ সালে অনুমোদিত ও কার্যকর হয়। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে ক্লাসিক থিয়েটারের পক্ষে তিনি অনেকগুলি ছবি নির্মাণ করেন। এরমধ্যে ভ্রমর, হরিরাজ, বুদ্ধদেব উল্লেখযোগ্য। ১৯০৩ সালে তিনি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র "আলিবাবা ও চল্লিশ চোর" নির্মাণ করেন, যা ১৯০৪ সালের এপ্রিলে প্রদর্শিত হয়েছিলো বলে কোন কোন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯১৭ সালে সংঘটিত এক রহস্যজনক অগ্নিকান্ডে তাঁর তৈরি সকল চলচ্চিত্র নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯১৭ সালেই প্রয়াত হন হীরালাল সেন। তবে, তাঁর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। মৃত্যুকালে ছোটোবেলার বন্ধু কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উপস্থিত ছিলেন।


বাঙালির আত্মবিস্মৃতির কথা আর নতুন করে বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। তাই দেশের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শক, প্রথম বিজ্ঞাপন চিত্র নির্মাতা, প্রথম তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং মতভেদে দেশের প্রথম কাহিনিচিত্র নির্মাতা তথা উপমহাদেশের সিনেমার ইতিহাসের প্রথম পুরুষ হীরালাল সেনকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া তো দূর অস্ত, তাঁকে মনে রাখাও জরুরি মনে করিনি আমরা। পর্যাপ্ত গবেষণা এবং সংরক্ষণ হলে নিঃসন্দেহে হীরালালের নামও এক বাক্যে আজ উচ্চারিত হত মেলিয়ে, পোর্টার বা গ্রিফিথের সঙ্গে।


লেখা: সাগর মল্লিক


Previous Post Next Post