প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন কবি বিনয় মজুমদার। প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্রী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, যিনি বর্তমান সময়ে পাশ্চাত্যের উত্তর ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক হিসেবে বেশ সুপরিচিত, এই মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন বিনয়। আর প্রেমে পড়েছিলেন কবিতার।
১৯৯৮ সালে 'অধরা মাধুরী' পত্রিকার জন্য বোধিসত্ব রায়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় জানিয়েছিলেন, "বার্লিনে নেমন্তন্ন করেছিল আলেকজান্ডার ডি ভার্স্ট বলে একজন ভদ্রলোক। আমি তাঁকে দরখাস্ত দিই, আমি চাকরি করতে চাই জার্মানিতে। আমি তাঁকে আমার গণিতের গোটা কয়েক খাতা পাঠিয়েছিলাম।
সেইগুলি পড়ে উনি আমাকে নিমন্ত্রণ করলেছিলেন। বললেন, তুমি এসো, আমাদের বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক কষাবে। তোমাকে মাইনে দেওয়া হবে ইউএসএ'র স্কেলে।
বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বের জন্য বিনয় মজুমদার জার্মানিতে গণিত অধ্যাপকের চাকরি পেয়েও যাননি। তখন তিনি বাবাকে বলেছিলেন, আমাকে জার্মানিতে ডেকেছে! অঙ্ক কষাতে হবে এমএসসি ক্লাসে, জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা বললেন, দ্যাখ, আমরা বুড়ো হয়ে গেছি। আমার বয়স আশি-পঁচাশি বছর। তোর মায়ের বয়সও ওই রকম। আমাদের বাড়িতে দেখাশুনা করার মতো কেউ নেই। তুই-ও একা আছিস। তুই আর যাসনে কোথাও। আমাদের দেখাশোনা কর। সুতরাং আমি আর জার্মানিতে যেতে পারিনি।"
অথচ এই বিনয় মজুমদারের জীবন কাটতে শুরু করলো অভাবে অনাহারে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, উৎপলকুমার বসুরা মিলে চাঁদা তুলে বছরে দেড়েকের মতো বিনয়কে সাহায্য করলেন। কিন্তু এরপর উনারা আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি। যারফলে অভাবে অনাহারে বিনয়কে ভুগতে হয়েছিল অসীম দু:খ যাতনা। বিনয়ের টাকার অভাব দেখে তাঁর বাবা তাকে প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে দিতেন। তা দিয়ে কিছুদিন চলতে পারতেন বিনয়। এরপর শুরু হত সেই চিরচেনা অভাব অনটন।
তিনি ভালোবেসেছিলেন, কবিতা আর গায়ত্রীকে। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও গায়ত্রীর প্রতি বিনয়ের সমান প্রেমানুভূতি ছিল। এটা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর এক কবিতায় এভাবে, ‘আমরা দু’জনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো/তোমার গায়ের রঙ এখনো আগের মতো, তবে তুমি আর হিন্দু নেই, খ্রিস্টান হয়েছো/তুমি আর আমি কিন্তু দু’জনেই বুড়ো হয়ে গেছি।’
বিনয়ের কবিতার বই বিক্রি করে একদিকে প্রকাশক লাভ করছেন, অন্যদিকে অর্থের অভাবে জীবনের শেষ পর্যায়ে অবিবাহিত বিনয়ের দিন কেটেছে চব্বিশ পরগনার ঠাকুর নগরের এক দরিদ্র ফুলবিক্রেতার সংসারে। এ জন্য তাঁকে কেউ কেউ ‘কবিতার শহীদ’ও বলে থাকেন। মরে গিয়ে যে কবি বেঁচে গিয়েছিলেন।
