শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান ও শিল্প-সাহিত্যের চর্চা • মোহাম্মদ আজম

শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান ও  শিল্প-সাহিত্যের চর্চা


সাংস্কৃতিক নবজাগরণের কোনো প্রকাশ শিল্প-সাহিত্যে ঘটছে কি না, তা বোঝার জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। চব্বিশের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের পরে আমরা এতটা পরিমাণ সময় অতিবাহিত করি নাই, যা থেকে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে। বরং বর্তমান সময়ের আবহে এ ধরনের উপাদান আছে কি না, আমরা তা নিয়ে আলাপ করতে পারি। আমার অনুমান, যা আমি আগেও বহুবার বলেছি বা লিখেছি, এ ধরনের একটা পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ বা ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প-সাহিত্যের চর্চা বহুদিন ধরেই আছে। এই ‘আছে’র ধারণাটা ব্যাখ্যা করা যাক।

আমাদের এখানে পঞ্চাশের দশকে একটা নতুন চিন্তাভাবনা তৈরি হয়েছিলো এবং সাহিত্য-শিল্পে তার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে। ওইসময় আমাদের এখানে বড় লেখক তৈরি হয়েছেন; বড় কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, শিল্পী আবির্ভূত হয়েছেন, এবং বড় বড় কাজ করেছেন। ষাটের দশকেও আমরা নতুন ধারা পাই। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে একটা উপাদান কমন, সেটা আধুনিকতা। পশ্চিমা বা কলকাতার প্রভাবে হোক অথবা ঢাকার নিজস্ব হোক। সে সময়ের শিল্পীরা নানা ধরনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি রপ্ত করতে চেয়েছিল এবং তার অন্বেষণে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেছিল। এমন লক্ষণ আমরা পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে পেয়েছি। এ দুই দশকে যারা লেখালেখি শুরু করেছেন, তারা প্রজন্মের দিক থেকে আলাদা হলেও ষাটের দশকে এসে প্রায় যৌথভাবে কাজ করেছেন। এটাকে আমাদের দেশের শিল্প-সাহিত্যের সবচেয়ে উর্বর এবং ফলবান সময় বলতে পারি। আবার ষাটের দশকে একটা প্রবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকও খানিকটা তার ভাগ পেয়েছে। যার ফলে সমস্ত সাহিত্যকর্মে ও শিল্পে এর প্রতিফলন রয়েছে। নতুনত্বের সবচেয়ে বেশি পরিচয় আছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়। সৃষ্টিশীল রচনায় তার ছাপ খুবই দৃশ্যমান। বাংলাদেশে আমরা যাদের বড় লেখক-শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী বলি, তাদের প্রত্যেকে কোনো-না-কোনোভাবে ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ ব্যাপারটাকে আমরা জাতীয় জাগরণ হিসাবে অভিহিত করতে পারি।

শহিদুল জহির এ ধারায় চমৎকার সব গল্প-উপন্যাস লিখেছেন এবং শহিদুল জহির বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। 

রেনেসাঁস বা নবজাগরণ সাধারণভাবে আরো বড় ব্যাপার বলে চিহ্নিত বা বিশ্লেষিত হয়। পঞ্চাশ-ষাটে হয়তো সবক্ষেত্রে সেই পরিমাণ বড়ত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু নানান ক্ষেত্রে জাগরণ ঘটেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে আমরা এক অর্থে এর পরিণতি বলতে পারি। আবার মুক্তিযুদ্ধও বাংলাদেশের মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ঘটনাচক্রে সত্তরের দশকে আমরা বড় লেখক তুলনামূলক কম পেয়েছি। কিন্তু একটা ঘটনা খুব ঘটেছে। ওইসময়ে আধুনিক সাহিত্য জটিলতার বিপরীতে, জনবিচ্ছিন্নতার বিপরীতে, জনলগ্নতা ও সারল্যের দিকে গেছে। ওইসময় একাধিক জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। এই আবির্ভাব কাকতালীয় নয়। সেটার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জনসংশ্লিষ্টতার খুব গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আশির দশকে আমরা সম্পূর্ণ নতুন ধারা দেখতে পাই। সে ধারার প্রচুর গুণ আছে, অনেক সৃজনশীল লেখক আবির্ভূত হয়েছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে বিশেষভাবে লিটল-ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক চর্চার জন্য ওই সময়টা বিখ্যাত। একই সঙ্গে আমরা দেখব, ওইসময়ে জটিলতার প্রতি, দুর্বোধ্যতার প্রতি আকর্ষণ দেখা গেছে এবং সাহিত্যে শৈল্পিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এটা একদিকে সাহিত্যের নিরীক্ষাগত ও ভাষিক উৎকর্ষগত প্রগতি সাধন করে, আবার অন্যদিকে সাহিত্য-শিল্পকে অনেক সময় গণগ্রাহ্যতার দিক থেকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রসারিত হতে বাধা দেয়।

আশির দশকে আমাদের সংস্কৃতি বা রাজনীতি বা মতাদর্শিক তৎপরতা বেশ কতকটা ভিন্ন ধারার দিকে গেছে। এটা পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। এ বিষয়ে হয়তো অনেকেই একমত হবেন, এখানে তখন প্রগতিশীলতার একটা বিশেষ ধারণা বিকশিত হয়েছিল। সেকুলার আদর্শের একটা ধারণা বিকশিত হয়েছিল। তারসঙ্গে একটা মৌলবাদ-বিরোধী তৎপরতাও শুরু হয়েছিল। এগুলোর সঙ্গে তাল রেখে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা নতুন সংস্করণ বিকশিত হয়েছে। এটা একটু ভিন্ন ঘরানার, অন্তত ষাটের দশকের তুলনায়, এবং সম্প্রতি একে আমি আমার লেখাপত্র ও বক্তৃতায় ‘উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলে চিহ্নিত করেছি।

প্রমিত খুবই জরি একটা বর্গ। এটা ছাড়া রাষ্ট্র চলে না, পড়াশোনা চলে না, আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম হয় না। কিন্তু এটা যখন খুব সংকীর্ণ ধারণার বশীভূত হয়, ভাষার বহু-বৈচিত্র্যকে অনবরত অপরায়ণ করতে থাকে, তখন ভাষার সৃষ্টিশীল সক্ষমতা কমে যায়। 

এটা ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদ থেকে বেশ অনেকটা ভিন্ন। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে প্রগতিশীলতা, সেকুলারিজম, মৌলবাদ-বিরোধী লড়াই ইত্যাদি গভীরভাবে মিশেছে। একই সাথে যাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চিহ্নিত করা হয়, সেটিও যুক্ত হয়েছে। এই পাঁচটি উপাদান আশির দশকে ঘনীভূত হয়েছে এবং সেটা শিল্প-সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। এ উপাদানগুলো বাংলাদেশে যেভাবে বুদ্ধিভিত্তিকভাবে এবং মতাদর্শিকভাবে চর্চিত হয়েছে সেটাকে আমি সমালোচনা করি, এবং অনেকক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ করি। সামগ্রিকভাবে এ প্রবণতা নেতিবাচক হয়েছে বলেই আমার পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এর একটা গণগ্রাহ্যতার দিকও ছিল। অন্তত শিক্ষিত নাগরিক ভদ্রলোক-সমাজের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। তার এক প্রমাণ হলো, এ সময়ে প্রচুর পরিমাণে সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, যেগুলো এই পাঁচটি উপকরণ দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং সাহিত্যকর্মগুলো সফল। একেবারে কালজয়ী বা ধ্রুপদি না হলেও প্রচুর ভালো সাহিত্যকর্ম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, গল্প, কবিতা এবং সিনেমার বড় অংশ আশি এবং নব্বইয়ের দশকে হয়েছে। যদি কোনো সাহিত্যকর্ম বা শিল্প সফল হয়ে যায় বা সার্থক হয়, তাহলে বুঝতে হবে, এর উপলব্ধির মধ্যে একটা অন্তরঙ্গতা আছে, সত্য ও সততা আছে। তার মানে, আমি এ উপাদানগুলোকে ক্রিটিক করলেও উপাদানগুলোর যে একটা চর্চাগত বাস্তবতা ছিলো, লোকে যে সেগুলো আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, চর্চা করেছে, সেটা না মেনে পারছি না। তার কারণ আমরা শিল্প ও সাহিত্যগত একটা সাফল্য দেখতে পাচ্ছি।

ধরা যাক, শহিদুল জহির এ ধারায় চমৎকার সব গল্প-উপন্যাস লিখেছেন এবং তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। ফলে আমি এর সৃষ্টিশীল ধারাটাকে অস্বীকার করতে পারছি না। মুশকিলটা হলো, এ পর্বের বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এগুলোর অন্তস্থ প্রগতিশীলতার ধারণা, সেকুলারিজমের ধারণা এবং মৌলবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ধারণা ইত্যাদি নানান চর্চাগত সীমাবদ্ধতার কারণে ক্রমশ একটা সংকীর্ণ একরৈখিকতা অর্জন করেছে। একটা সিঙ্গেল মিনিংনেস বা একার্থকতা অর্জন করেছে। যখন কোনো একটা ব্যাপার একার্থক হয়ে নির্দিষ্ট ও আরোপিত সত্যের বাহক হয়ে ওঠে, সংকীর্ণ ও একরৈখিক হয়ে ওঠে, তখন তার সৃষ্টিশীল সক্ষমতা স্বভাবতই কমে যায়। সৃষ্টিশীলতা মানেই বহু অর্থের সম্ভাবনা, উন্মুক্ততাহেতু নতুনত্বের সম্ভাবনা। কিন্তু আমাদের এখানে কালক্রমে চর্চাগত কারণে এ ব্যাপারগুলোতে ঘোরতর সংকীর্ণতা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে আমি ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও বাংলাদেশ’ এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি ও নতুন বাংলাদেশ’ বইতে বিস্তারিত আলাপ করেছি।

এ সংকীর্ণতার বিপরীতে আমরা নব্বইয়ের দশক থেকে আংশিকভাবে এবং নতুন শতকের গোড়া থেকে অপেক্ষাকৃত কার্যকরভাবে এবং বৃহদাকারে একটা বিপরীত ঘরানার চর্চা দেখতে পাই। এ চর্চা আগের পাঁচটি প্রধান ধারণার সংকীর্ণতা ও একার্থকতার বিপরীতে কাজ করেছে। পুরনো চর্চার সাথে দলীয় আধিপত্য যুক্ত হয়ে যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অচলায়তন তৈরি করেছিল, তার বিপরীতে কাজ করেছে। এর ফলে শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় একটা নতুন সম্ভাবনা জাগ্রত হয়েছে। সে সম্ভাবনার কারণ ও লক্ষণ দু-একটা উদাহরণ দিয়ে বলছি।

ধরা যাক, আমাদের এখানে প্রমিত বানান, প্রমিত উচ্চারণ এবং সার্বিকভাবে প্রমিত বাংলার একটা বিশিষ্ট ধারণা বিকশিত হয়েছে। ভাষার প্রমিতায়নের জরুরত দিয়ে একে সামান্যই ব্যাখ্যা করা যাবে। এটা একটা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ঘটনা। পূর্বোক্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীলতা ইত্যাদির সংকীর্ণ ধারণার সাথে মিল রেখেই ঘটনাটা ঘটেছে। এ কারণেই তখন কলকাতার সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও অর্জনের সাথে কোনোরূপ ফারাক রাখার প্রয়োজন কেউ বিশেষ একটা বোধ করে নাই। তখনকার প্রমিতায়নের প্রতিটি উদ্যোগে তার পরিষ্কার প্রতিফলন আছে। আমাদের এখানে তখন বিশেষ ধরনের আবৃত্তি ও প্রমিতের চর্চা প্রবল হয়েছিল। এটা আশি-নব্বইয়ের দশকের মানুষেরা ভালো বুঝতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতেই হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এর ফলে আমরা একটা সজীব সংস্কৃতিচর্চার আবহ পেয়েছি। ভালো আবৃত্তিকার পেয়েছি। ফলে এই ব্যাপারটা অপ্রয়োজনীয় বা খারাপ না। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতাহেতু এর সুফল সমাজদেহে সঞ্চারিত না হয়ে নানা ধরনের প্রতিপক্ষতা ও জড়তা তৈরি করেছে।

প্রমিত খুবই জরুরি একটা বর্গ। এটা ছাড়া রাষ্ট্র চলে না, পড়াশোনা চলে না, আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম হয় না। কিন্তু এটা যখন খুব সংকীর্ণ ধারণার বশীভূত হয়, ভাষার বহু-বৈচিত্র্যকে অনবরত অপরায়ন করতে থাকে, তখন ভাষার সৃষ্টিশীল সক্ষমতা কমে যায়। নব্বইয়ের দশক থেকেই এ চর্চার একটা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, এবং বিশ শতকে এসে তা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। সেখানে আমরা দেখব, বিপুল পরিমাণ সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক প্রমিতের নামে নির্দিষ্ট ভাষারূপ আর মানছে না। তারা প্রবন্ধ, গল্প, কবিতায় মুখের উচ্চারণ এবং নানাবিধ অপ্রমিত রূপের ব্যবহার করছে।

ভাষারূপের সাথে যখন সৃষ্টিশীলতা ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন তাকে গুরুত্ব দিতে আমরা বাধ্য হই। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ লেখকদের একটা বড় অংশ এ কাজটা করছে। তারা খুব সফল কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখছে। যখন এটা হয়ে যাবে, তখন বুঝতে হবে এর একটা মূল্য আছে। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা হলো, এ সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। এ-কারণে, ভাষার মধ্যে নানা উচ্চারণভঙ্গি থাকে, শব্দরূপের বিবিধতা থাকে; আঞ্চলিক ও অপ্রমিত ভাষারীতির মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাগবিধিগত ঐশ্বর্য থাকে। এগুলোই ভাষার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ সম্পদ। আমি দেবেশ রায় থেকে ধার করে বলি, এসব উপাদানের মধ্যে জিহ্বা এবং গলার উষ্ণতা অনেক বেশি সঞ্চারিত থাকে। বইয়ের ভাষা কিংবা প্রমিত ভাষা হলো ঠান্ডা এবং বিচ্ছিন্ন। মৌখিক ভাষার পাটাতনে উচ্চারণ ও অর্থের বিচিত্র কল্লোলে ভাষার মধ্যে যে সপ্রাণ সজীবতা সঞ্চারিত হয়, প্রমিতে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে তার ঠাঁই হয় না। অপ্রমিতের বিচিত্র সংরাগ আমাদের আশি-নব্বইয়ের দশকের প্রভাবশালী সাহিত্যধারায়ও ছিল। কিন্তু প্রমিতের শাসন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তির কারণে তার প্রবেশ ছিল সীমিত ও কুণ্ঠিত। এ অন্যায় শাসন ও প্রতিপত্তি নস্যাৎ হওয়ার কারণে ভাষারূপের ক্ষেত্রে সাহিত্য অবারিত ভাষাক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। এর সুফল আমরা নিত্য দেখতে পাচ্ছি। আগামী দিনগুলোতে তা আরো বাড়বে বলে লক্ষণ দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে। একইসঙ্গে আমাদের প্রমিত বাংলার সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ অকারণে প্রচলিত ফারসি-আরবি শব্দের প্রতি বিচিত্র বিতৃষ্ণা লক্ষ করা গেছে। অভিধানে, উচ্চারণে এবং ব্যবহারগত দিক থেকে সামাজিক সংস্কৃতির মধ্যে আমরা এ লক্ষণ দেখেছি। এ সংকীর্ণতা এবং আরোপিত সংস্কৃতিও এখন বেশ অনেকটা ভেঙে গেছে। প্রচুর লেখক প্রচলিত ফারসি-আরবি শব্দ এবং আঞ্চলিক শব্দ দারুণভাবে ব্যবহার করছেন। সব মিলিয়ে একরৈখিকতা, সংকীর্ণতা এবং অর্থগত একার্থকতার যে প্রতাপ প্রতিষ্ঠিত ছিলো, তার বিপরীতে নানা ধরনের উন্মুক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে সৃজনশীলতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে।

এ পটভূমিতে আমার প্রস্তাব, ২০২৪ সালে যে প্রচণ্ড প্রাণঘাতী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা গিয়েছি, তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমি অনেকদিন ধরেই তৈরি হয়ে আসছে। একদিকে সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদির খুবই সংকীর্ণ ও একার্থক ধারণা বিকশিত হয়ে অবশেষে রাজনৈতিক ক্ষমতার অঙ্গীভূত হয়েছে, যা আমরা রাখঢাকহীনভাবে গত দশ-বারো বছরের রেজিমে দেখেছি। তার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ মানুষ এটাকে না মেনে একটা উন্মুক্ততার চর্চা করেছে। আমার নিজের বিবেচনায়, শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পাটাতন হলো সংকীর্ণতার বিপরীতে উন্মুক্ততা, একার্থকতার বিপরীতে বহু-অর্থকতা। আমার প্রস্তাব, এ সম্ভাবনার ভিত্তিতেই অভ্যুত্থান ঘটেছে। মানে অভ্যুত্থানের ভেতর থেকে নতুন করে এসব হয়েছে, এমন নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে এসব ছিল বলেই ঘটনাটা ঘটা সম্ভব হয়েছে।

আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব, যেটা আগে থেকে ছিল, চব্বিশের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেটা উত্তমরূপে প্রকাশিত হয়েছে, কিংবা বলতে পারি, আমরা সাফল্যের ক্ষেত্রে হয়তো একটা নবতর সম্ভাবনার দিকে গেছি। সে সম্ভাবনার ভিত্তির মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক-মতাদর্শিক ও তৎপরতাগত সংকীর্ণ সীমার আওতাভুক্ত অল্প কিছু মানুষের বাইরে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ মানুষকে ‘অপর’ হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষেরা আছেন, নারী আছেন, গ্রামের মানুষ আছেন, ইসলামি ভাবধারার লোক আছেন, বামপন্থী লোক আছেন। ওরাই সংখ্যাগুরু। যারাই সংকীর্ণ-একার্থক ভাষাকাঠামোয় খাপ খাচ্ছিল না, তারা প্রত্যেকে অপরায়ণের মধ্যে পড়ে গেছে। অপরায়িত বিচিত্র মানুষদের নানান ধরনের চর্চা ওদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ঠ করেছে। ক্রমশ একত্রে কাজ করার ভাষা তৈরি হয়েছে। একটা পাটাতন তৈরি হয়েছে, পরিসর তৈরি হয়েছে। যেখানে আমরা বিচিত্র ধরনের মতাদর্শ, দল, উপদল, সংস্কৃতি, স্থানএগুলোকে একত্রিত হতে দেখেছি। আমরা এটাকে বলি এজমালি ভাষা-পরিসর। আন্দোলনটা আসলে এই এজমালি ভাষার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। সেখানে বিচিত্র মতের ব্যাপারগুলো একত্র হয়েছে। একত্র হবার কারণে তার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়েছে। সংকীর্ণতা না থেকে যদি উন্মুক্ততা থাকে, বহু বৈচিত্র্য যদি একত্র হয়, তাহলে সম্ভাবনা বাড়বেই।

এই দু-রকম সম্ভাবনার কথা আমি বললাম। এ সম্ভাবনার ভিত্তিতেই আসলে আন্দোলনটা সংঘটিত হয়েছে। তার মানে, এ আন্দোলন পরিণতির দিক থেকে তো বটেই, কিন্তু আসলে কার্যকারণের দিক থেকেই অর্থাৎ তার পূর্বতন পটভূমির দিক থেকেই অসাধারণ সম্ভাবনাময়।

প্রশ্ন হলো, আন্দোলনের পরে আমরা সে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে দেখছি কি না। বলতে হবে, আমরা তা দেখছি না। আন্দোলনে বিচিত্র মত-পথের মানুষ এক পাটাতনে লড়াই করেছিল। এটা আমরা দেখেছি। ফটোগ্রাফেও দেখেছি। বিশেষ ভাষার ব্যবহার, কর্মসূচি ঘোষণা এবং ওই কর্মসূচি ও ভাষার আনুকূল্যে এমন ঘটনা ঘটে যাওয়া, যেটা অসম্ভব মনে হতো। আমরা দেখেছি, প্রচুর ফটোগ্রাফে বোরখা ও পশ্চিমা পোশাকের মেয়েরা একসাথে অবস্থান করছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এবং বাম আন্দোলনের মানুষজন এক সমাবেশে। অনেকে বলে থাকেন, যেহেতু আমরা প্রচণ্ড স্বৈরাচারী রেজিমের মধ্যে ছিলাম, সেখানে প্রবল প্রতিপক্ষ অনেককে একত্র করেছে। ঠিক এ জায়গাতেই আমি জোরালোভাবে যুক্তিটা দিতে চাই, একত্র করার কাজটা ঘটতে পেরেছে একমাত্র ওই এজমালি ভাষা ও পাটাতন তৈরির মাধ্যমে। কিন্তু আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার পরে আমরা ওই ব্যাপারটাকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর দেখতে পাচ্ছি না।

এখানে সংযোজক হিসাবে দুটো কথা বলে রাখা দরকার। আন্দোলন একটা ইভেন্ট বা মহাঘটনা। তাতে কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়। স্থান এবং কালের মিলনবিন্দুতে কোনো একটা ইভেন্ট ঘটে। তার একটা লম্বা ঐতিহাসিক পরম্পরা থাকে। তার নানান ধরনের সমসাময়িক ঘটনার পরম্পরা থাকে। পুরো ব্যাপারটা মিলে একটা ইভেন্ট তৈরি হয়। কোনো ইভেন্টেরই আসলে আগের অবস্থা থেকে পুরো যুক্তিটা পাওয়া যায় না; আবার পরবর্তীকালের অবস্থা দিয়েও পরম্পরাটা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। দুনিয়ার কোথাও তা হয়নি। আমাদের যে সম্ভাবনা, আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটার পরিপূরণ অনেক কম হয়েছে। আমার বিবেচনায় কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো, একটা বৈপরীত্যমূলক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পটভূমির মধ্যে আমরা ছিলাম, যেখানে প্রবল শাসকপক্ষ একটা সংকীর্ণ, একার্থক, একরৈখিক মতাদর্শিক উচ্চারণকে একমাত্র ‘সত্য’ হিসেবে প্রকাশ করেছে এবং তার বিপরীতে অন্য ‘সত্য’গুলোকে ফেলে দিয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী’ একটা সরল বাইনারি। কিন্তু ব্যাপারটা তো এতো সরল নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেই অসংখ্য রকমফের আছে, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের মধ্যে অনেক রকমফের আছে। প্রচুর লোক আছে যারা মুক্তিযুদ্ধের এ ব্যাখা পছন্দ করেন না, তাদের অন্য ব্যাখ্যা আছে, অন্য তাৎপর্য আছে। প্রচুর লোক মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাস হিসেবে না দেখে বর্তমান হিসেবে দেখতে চায়। প্রচুর লোক এটাকে ব্যক্তিসমূহের ব্যাপার মনে না করে সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর ব্যাপার মনে করে। তার মানে, দেয়ার আর সো মেনি ট্রুথস। কিন্তু আমাদের এখানে মতাদর্শপীড়িত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপারটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন ট্রুথ একটা এবং তার বিপরীতে সব মিথ্যা। মানে সাদা এবং কালো। এই যে প্রবল ভয়াবহ নেতিবাচক রাষ্ট্র-বিরোধী, দেশ-বিরোধী, জনগোষ্ঠী-বিরোধী, জনগণ-বিরোধী চর্চা, তা আমাদের এখানে প্রবলভাবে ছিল। যেখানে সাদা-কালো বৈপরীত্যমূলক কাঠামোর মধ্যে সবকিছুকে ফেলে আমরা কথা বলি, রাজনীতি করি, রাষ্ট্র চালাই, ফেসবুকিং করি, গালিগালাজ করি, পক্ষপাত করি। এর মধ্যে আরাম আছে। মূলত এটা ভয়াবহ ব্যারাম।

এই ব্যারাম রাষ্ট্র গড়তে দেয় না, রাজনীতি করতে দেয় না, রাজনৈতিক সমাজ গড়তে দেয় না। এটা গোষ্ঠীর ব্যাধি। এটা একটা বন্যতা। এটা পিছিয়ে পড়া একটা ব্যাপার। এটাকে খারাপ অর্থে আমি ‘গ্রাম্যতা’ বলবো। রাষ্ট্র আসলে ভিন্ন জিনিস। সেখানে মিলনের নানান ধরনের সূত্র আবিষ্কার করতে হয়। এজমালি ভাষা আবিষ্কার করতে হয়। এগুলো কিন্তু কঠিন কাজ। আমরা ছিলাম প্রবল বিরোধিতার আরামের মধ্যে। আমি সহজে একটা গালি দিতে পারি, বা পক্ষপাত করতে পারি। কিন্তু বিশ্লেষণ করে যোগাযোগের সূত্র উন্মোচন করা অনেক জটিল কাজ। এ ধরনের একটা পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার পরে আমাদের বেশিরভাগ মানুষ আবার সেই পুরোনো আরামের মধ্যে ফিরে গেছে। তারা আবার পারস্পরিক বিরোধটাকেই বড় করে তুলেছে। তারা প্রত্যেকেই পরিমাণে বিপুল; তারা ভেবেছে, প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে আছে। ফলে তাদের যে মতাদর্শ, তাদের যে গোষ্ঠীগত ভাষা, তাদের যে আকাঙ্ক্ষা সেটা আরোপ করার এখনই সবচেয়ে ভালো সময়। ব্যাপারটা ঘটেছে আসলে জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অপরিপক্বতার কারণে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, যেটাকে আমরা বলতে পারি রাজনৈতিক সমাজ, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পলিটি’ (Polity), এটা কল্পনা করার মতো পরিপক্বতা আমরা দেখাতে পারিনি। আমি বলব, এটা দূরদৃষ্টির অভাব। সে পিছন দিকের সময়টাকেও ভুলে গেছে, সামনের দিকের যে অনাগত সময় আছে সেটাকেও ভুলে গেছে। সে একদম বর্তমানের মুহূর্তটাকে চূড়ান্ত মুহূর্ত ভেবে ক্রিয়া করেছে। এটা কোনো রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য না। এটা রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য না। রাষ্ট্রীয় নাগরিকের কাজ অনেকদূর পর্যন্ত ভাবা। ফলে আমি বলব, মুহূর্তটা আমরা অনেক দূর পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছি। যেটা হওয়ার কথা ছিলো, অনেকদূর পর্যন্ত তার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। আন্দোলনের পরে এটাকে টেনে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া জরুরি ও ফলপ্রসূ করা উচিত ছিল। যার মধ্য দিয়ে একদিকে বহু-অর্থক, বহুবর্ণময় এবং এজমালি একটা পাটাতন ও ভাষা জোরালো হবে। সে পরিশ্রমটা না করে আমরা পুরোনো সংকীর্ণ বাইনারির মধ্যে ক্রিয়া করেছি।

প্রশ্ন হলো, এর ফলে কি সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে? না, শেষ হয়নি। শেষ হয়নি অন্তত দুটো কারণে, এবং আরো একাধিক আনুষঙ্গিক

কারণ আছে।

একটা কারণ হলো, যে সম্ভাবনার কথা আমি একটু আগে ব্যাখ্যা করলাম, তা জুলাই অভ্যুত্থান থেকে শুরু হয়নি। আরো অন্তত দুই দশক বা তারও আগে থেকে একটু একটু করে বিকশিত হয়ে আসছে এবং তার ধারাবাহিকতা আছে। ফলে অভ্যুত্থানের পরে আমাদের সক্রিয় জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ অবিমৃষ্যকারিতা দেখালেও, দূরদৃষ্টির অভাব দেখালেও, জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক ভাষাসম্পদ থেকে তা হারিয়ে যায়নি। সেগুলো একটু চাপা পড়েছে, উত্তেজিত জনতার জঙ্গি হাঙ্গামার মধ্যে তার স্বরটা কানে আসছে না। কিন্তু জিনিসটা আছে, চর্চাটা আছে। ফলে ওই সম্ভাবনাও আছে।

দ্বিতীয় জিনিসটা হলো, ইভেন্ট বা মহাঘটনা নিজেই একটা স্বতন্ত্র সত্তা। সফল গণঅভ্যুত্থান অনেক বড় ব্যাপার। একে কেবল আগের ইতিহাস এবং পরের কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটার নিজস্ব যুক্তি থাকে, নিজের বর্তমানময়তা থাকে, এবং সেগুলোকে সঞ্চারিত করার ক্ষমতা থাকে। সে নিজেই অনেকদিন পর্যন্ত বিচিত্রভাবে মানুষকে প্রভাবিত করতে থাকে। এ অস্তিত্বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হবে, ইতিহাস রচিত হবে, এবং যখন সে নিজে সময়-পরিক্রমায় স্মৃতি হয়ে উঠবে, তখন মানুষ একে ফিরে ফিরে দেখবে। কারণ ইভেন্ট হিসেবে তার ওই সমস্ত গুণ বা বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা এখন সংকীর্ণতার দিকে ফিরে গেছি। আলাদা আলাদাভাবে কাজ করতে চাই। প্রত্যেকে রাষ্ট্রকে নিজেদের ছোট্ট ছোট্ট গোষ্ঠীর মতো করে গড়তে চাই। কিন্তু ইভেন্ট বারবার মনে করিয়ে দেবে, এটা হবার নয়। যেটা হওয়ার সেটা ওই ইভেন্টে ঘটেছিল। ঘটেছিল মানেই সে সম্ভাবনা পরীক্ষিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, বাংলাদেশ আঠারো কোটি মানুষের দেশ। এই ইভেন্ট সফলভাবে আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারিনি। কিন্তু বিপুল মানুষের মধ্যে গুরুতর এক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়ে ঘটনাটা ঘটে গেছে। ওই স্মৃতি মানুষকে প্রতিনিয়ত জানান দিতে থাকবে যে, সে নতুন এক বাংলাদেশের জন্য লড়াইটা করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশ দিয়ে তার চলবে না।

এই নতুন বাংলাদেশটা কেমন? যে যতভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, আমার কাছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ কথাটার প্রধান এবং চূড়ান্ত অর্থ একটাই – রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ তার আঠারো কোটি মানুষ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারছে কি না, একটা রাষ্ট্র তার জনগোষ্ঠীকে সম্বোধন করতে পারছে কি না, সব নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না! এই যে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা বিপুল পরিমাণ মানুষের মধ্যে জেগেছে, বিদ্যমান ক্ষমতা-কাঠামোর বিভিন্ন অংশীদারগণ সে ভাষাকে চাপা দিয়ে তাদের অব্যবহিত ক্ষমতা, ইডিয়লজি এবং অপরাপর প্রাপ্তিকে বড় করে তুলেছে। কিন্তু মানুষ তাদের স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। কারণ মানুষ তো নতুন বাংলাদেশ চায়। মানুষ তো এমন বাংলাদেশ চায় যেখানে রাষ্ট্রতন্ত্র কাঠামোগতভাবে ও জনগোষ্ঠীর দিক থেকে এ অবস্থায় থাকবে না। এ ঘটনাই বাংলাদেশকে আর আগের মতো থাকতে দেবে না। দিতে পারে না।

নতুন বাংলাদেশে কোন ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা লোকে করবে, তা ঠিক করে দেয়া যাবে না। কেবল চর্চাকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাদির বন্দোবস্ত করতে হবে। কাঠামোগত সুবিধা দিতে হবে। কাঠামোগত সুবিধা বলতে কিছু মানুষ, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সাহায্য। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারটি উপলব্ধি করার মতো লায়েক হতে হবে। কোনো ধরনের প্রেসক্রাইবড সংস্কৃতিচর্চা, সাহিত্যচর্চা চলবে না। এগুলা অত্যন্ত বাজে জিনিস। এগুলো ব্যতিক্রমহীনভাবে সংকীর্ণতা তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, যেকোনো ধরনের সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার মূল কথা হলো, মানুষের অন্তঃস্থ সক্ষমতাকে বাইরে প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। এটা কিন্তু কাউকে কোনো ব্যাপারে প্রশিক্ষিত করা নয়। প্রশিক্ষণটা হলো কলাকৌশল সরবরাহ করা। এটা জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন হয়। সংস্কৃতিচর্চা বা সাহিত্যশিল্প চর্চার মতো দূরসঞ্চারী কাজ এবং সৃজনশীল কাজ কাঠামো বানিয়ে হবে না। কোনোরকম বাধ্যবাধকতা কিংবা পরিকল্পনা দিয়ে হবে না। বর্তমান বাংলাদেশের মতো অক্ষম রাষ্ট্রে অবশ্য এসব নিয়ন্ত্রণকে রাষ্ট্রের কাজ ভাবা হয়।

তাহলে নতুন রাষ্ট্র কী করবে? আমাদের দেখতে হবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশের যথেষ্ট বন্দোবস্ত সমাজে আছে কি না। যেমন, আজকালকার তথ্য-প্রযুক্তিগত বহু দিক মানুষের সৃষ্টিশীল চর্চা ও বিকাশের জন্য আবশ্যিক গণ্য হচ্ছে। রাষ্ট্র দেখবে, এর জন্য সমাজ এবং কাঠামো প্রস্তুত কি না! রাষ্ট্রীয় নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে, সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি অফিস, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন সবকিছু প্রচুর পরিমাণে আছে। নতুন রাষ্ট্র এর সবকিছুকে কাঠামোগত ও আর্থিক সাহায্য করবে, আর সমস্ত জনগোষ্ঠী অবারিত প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য ন্যূনতম জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রটাকে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। আমাদের রাষ্ট্র অত্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন, জনগণ থেকে খুবই দূরবর্তী। এ রাষ্ট্র এমনকি রিকশা পর্যন্ত ম্যানেজ করতে পারে না। এটা একটা বিস্ময়কর আর লজ্জাকর ব্যাপার যে, বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়ে পাবলিক লাইব্রেরির কোনো শাখা নাই । এ রাষ্ট্র যে কী পরিমাণ অবিমৃষ্যকারী, তার অন্যতম প্রমাণ এই যে, এ দেশের শিক্ষায় বরাদ্দ আছে দেড় শতাংশের (১.৫%) কিছু বেশি। এটা প্রায় উচ্চারণের অযোগ্য! ভারত-পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রে শিক্ষায় বরাদ্দ শতকরা ৪ শতাংশের কাছাকাছি। আমাদের তো অন্তত ওই স্তরে যেতে হবে। তাই আমি বলি, বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। একটা আলোচনাই কেবল জরুরি–আগামী তিন-চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এ বরাদ্দ কীভাবে অন্তত ৪% করা যায়। তারপর আমরা দেখব, শিক্ষা নিয়ে কী আলোচনা করা যায়। আমাদের রাষ্ট্র আসলে কোনো ধরনের কাঠামোগত সুবিধাপ্রদানের মধ্যে নাই। আমার প্রস্তাব, রাষ্ট্রকে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে সরকারের যথেষ্ট পরিমাণে ভালো কাঠামো আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গেলে ভালো হতো, কিন্তু প্রয়োজনীয় কাঠামো সেখানে নাই। একই কারণে গ্রামেও যেতে পারবে না। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে আছে। ফলে রাষ্ট্রের সমস্ত কর্মসূচির কেন্দ্র হবে উপজেলা। কেবল এটুকু হলেই দেখব, বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হয়ে জনগণের কাছে যেতে পারছে। নতুন রাষ্ট্র মানে বিস্তর পরিকল্পনা করে বহু পরিবর্তনের পরে এক শুভ সকালে কাজ শুরু করা নয়।

সরকার বা রাষ্ট্র বলে দেবে না যে লোকে এই এই কর্মসূচি পালন করবে। কেবল পূর্ণ কাঠামো আর আর্থিক বরাদ্দ নিয়ে প্রান্ত পর্যন্ত চলে যাবে। মানুষরাই ঠিক করবে তারা কী করবে। মানুষ তো অসীম সম্ভাবনাময়। যে পরামর্শ দিচ্ছে, এটা করো, ওটা করো, সে তার সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। এ সংখ্যা লাখে ৫-১০ জন। আর মানুষ হলো কোটি কোটি। তাহলে ১০জন এই কোটি কোটি মানুষের সক্ষমতাকে আরোপিত ছাঁচে ফেলে একদম সংকীর্ণ করে ফেলছে। বিপরীতে সে যদি পুরো সুযোগটা নিয়ে প্রান্ত পর্যন্ত যায়, তাহলে ওই কোটি কোটি মানুষের সক্ষমতাই তাকে বলে দিবে কী করতে হবে।

তার মানে এই নতুন উদ্যমের মধ্যে, নতুন উদ্যোগের মধ্যে আমরা যদি নিশ্চিত করতে পারি, আমাদের কেন্দ্রীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ ও আমলারা লোকে কী করবে সে দিকনির্দেশনা না দিয়ে কেবল জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাদির এনতেজাম করে, তাহলেই রাষ্ট্র একটা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। রাষ্ট্র যদি কেবল পদ্ধতিমাফিক ব্যবস্থাপনার কাজটা করতে পারে, তাহলেই পাশার দান যাবে উল্টে। এরপর আর একটাই করণীয় থাকবে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো। মানুষ তো নিজেই নিজের কাজ করবে। এখানে রাষ্ট্রের কী কাজ? আমলাদের কী কাজ? ব্যবস্থাপনা ছাড়া আর কী!

অন্য সবকিছুর মতো শিল্প-সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক নানাবিধ চর্চাও একই ধারাবাহিকতার অংশ। আমরা আশা করি, নতুন রাষ্ট্র দিকনির্দেশনা দেবে না, আরোপণ তো নয়ই, কেবল কাঠামোগত সুবিধা আর আর্থিক জোগান দিয়ে বাকিটা জনগণের হাতে ছেড়ে দেবে। তাহলেই এসব চর্চায় প্রকৃত প্রগতি সম্ভব হবে।
Previous Post Next Post