জল জঙ্গলের দেশ সুন্দরবন। সে দেশে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ বাস করে। আর আছে বাঘ কুমিরের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা কিছু সর্বহারা মানুষ। মহাকাব্যিক এই উপখ্যানে উঠে এসেছে ভাটির দেশের সেই সব জীবন, জীবিকা, প্রকৃতি, ইতিহাস আর লোকপুরাণকে জীবন্ত চেহারা। গল্পে সুন্দরবনের গন্ধ অাছে অার অাছে নদীর একটা টান। অমিতাভ ঘোষের "ভাটির দেশ" ভয়ংকর সুন্দর দেশের গল্প। অাসলে মোদ্দা গল্পটা হল ভাটির দেশের গোড়াপত্তনের ইতিহাস। যে গল্প জীবনের কথা বলে। এক অাদর্শ সমাজ ব্যবস্থার মহা উপাখ্যান এই গল্প।
গত শতাব্দীর শেষ দিকের কথা। এই ভাটির দেশে অাদর্শ সমাজ গড়ার চেষ্টা করেন এক ইংরেজ সাহেব, জন হ্যামিলটন নাম তাঁর। কোম্পানির কাজের জন্য বিলেত থেকে পাড়ি জমান বঙ্গদেশে। পরিশ্রম করে প্রচুর অর্থ রোজগার করেছেন বটে কিন্তু অন্য সবার মতো মদিরা অার নারীতে ডুব দিলেন না তিঁনি। জাহাজের কাজ করতে গিয়ে ভাটির দেশ দুচোখ জুড়ে দেখেছেন। অার স্বপ্ন বুনেছেন এক অাদর্শ সমাজ গড়ে তোলার। সেই স্বপ্নের সূত্র ধরে লেখা এই ভাটির দেশের ইতিহাসের গোড়াপত্তন ঘটে। খুব একটা সুন্দর ছিলো না এই পথচলা। কি ঘটেছিলো এই চলতি পথে?
উপন্যাস মানে বানানো গল্প অার কল্প লোকের বর্ণনা। বড়জোর খুব বেশি হলে একটা সাদা কালো জীবনের গল্প। কিন্তু অমিতাভ ঘোষের "ভাটির দেশ" নিছকি কোন গল্প নয়। একটু গল্প, একটু ইতিহাস অার বাকিটা উপন্যাস। তার থেকে বড় কথা ভূত অার ভবিষ্যতের কথা বলে এই গল্প। ঝড় বন্যায় সুন্দরবন অামাদের রক্ষা করে কিন্তু অামরা সুন্দরবনের জন্য কতটা ভাবি? সেই সুন্দরবন এলাকায় যাদের বসবাস তাদের কথা কতটা জানি। সময় যখন নিথর হয়ে যায় ভয়ের ধাক্কায় তখন কি ঘটে সেখানে, কি হয় সেই সব গল্পেরা? সেই সব গল্পেরা ডানা বেঁধেছে এই উপন্যাসের পরতে পরতে।
১৯০৩ সালের কথা, সুন্দরবন মানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাপের জমিদারি। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি। কিন্তু হ্যামিলটন সেসব কেয়ার করেন না। সে সরকারের কাছ থেকে দশ হাজার একর জমি কিনে ফেললেন। এবং ঘোষণা করলেন, যে এখানে থাকবে তাকে বিনে পয়সায় জমি দেওয়া হবে। শুধু গতরে খেটে নিজের অন্ন ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এখানে কোন জাতি, ধর্ম,উঁচু-নিচু প্রভেদ চলবে না। মানুষ তখন খেতে পায় না অবস্থা। ওদিকে অাবার জমিদারি প্রথায় প্রজারা দিশেহারা। দলে দলে মানুষ অাসতে লাগলো সুন্দরবনের দ্বীপগুলোতে। নৌকা, ডিঙি, সাঁতরে যেভাবে পেরেছে এসেছে এই সুন্দরনে। কিন্তু পরিশ্রমই কি বাদাবনের ভাগ্য ফেরাতে পেরেছে?
মানুষ খেতে পায় না, শিক্ষা নেই, দিক্ষা নেই কি হবে এই মানুষদের ভবিষ্যৎ! লোনা মাটিতে ফসল হয় না। কেও বাঘের পেটে যায় তো কেও কুমিরের পেটে। এভাবে চলতে থাকে বাদাবনের জনজীবন। ঠিক সেই সময় এই বাদাবনে অাগমন ঘটে এক দেবদূত দম্পতির। সারা জীবন লেনিন পাঠ করা, সমাজতন্ত্রের গীত গাওয়া নির্মলের ভাবোদয় হয় এখানে এসে। কাজ শুরু হয় একটা স্কুলের শিক্ষকতা দিয়ে। অার স্ত্রী নীলিমা কাজ করে মহিলাদের অাত্ম উন্নয়নে। অক্লান্ত পরিশ্রম অার ধৈর্যের ফলে গড়ে উঠে এই সমাজ। খুব একটা সহজ ছিলো না এই পথচলা। তাদের পরিশ্রমে গড়া সমাজ এখন ঐ অঞ্চলের অাদর্শ।
কিন্তু একটি চিঠি, চিঠির উপর নাম লেখা কানাই। নির্মলের লিখে যাওয়া এই চিঠিতে কি অাছে? যৌবনে কবিতা গল্প লিখে খ্যাতির অাশা ছিলো কিন্তু এ কি তেমন কিছু? নীলিমা ডেকে অানে কানাইকে। শহর ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে নদী বনের দেশে চলে অাসে কানায়। একটা দ্বীপে বাস করা একজন মানুষ কি এমন লিখে যেতে পারেন। চিঠি খুলে তাজ্জব বনে যায় কানাই। এ কোন চিঠি নয়, নয় গল্প কতিতা। এ যেন এক ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের এক গনহত্যার কথা অাছে এখানে। বাঙালি উদ্বাস্তু অার ভারত সরকারের কাছ থেকে পলায়ন করে অাসে এই বনে। দলিত বা হরিজন এই মানুষদের কি সেই ইতিহাস, কি অাছে এখানে লেখা? এই রোমান্স গল্পঘেরা চিঠির ভবিষ্যতই বা কি হয়েছিলো?
অন্যদিকে বিদেশ থেকে দেশে পাড়ি জমায় পিয়া। গন্তব্য সুন্দরবন, উপকূলীয় অঞ্চলে ডলফিনদের উপর গবেষণা করা। ইংরেজি ছাড়া কোন ভাষা জানে না। শৈশব কৈশোর ঐ বিলেতে তাই বাংলাটা শেখা হয়নি। এই গ্রাম্য পরিবেশে কি সুন্দর ছিলো পিয়ার জন্য? ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের নৌকা থেকে পিয়া হাবুডুবু খায় নদীর জলে। সেখান থেকে ঠাঁই হয় ফকিরের ডিঙি নৌকায়। যাত্রাটা সহজ নয়, ভয়ংকর সুন্দর! অগত্যা নতুন এক যাত্রা শুরু হয় পিয়ার। ছোট একটা ডিঙি নৌকা, পরিচিত এক পুরুষ মধ্য বয়সী মাঝি অার পিয়ার গবেষণা।
ওদিকে লুসিবাড়িতে নির্মল, নীলিমা মাসির বাদাবন ট্রাস্ট অন্যদিকে পিয়ার যাত্রা দুইয়ে মিলে চলতে থাকে উপন্যাসের ট্রেন। যাত্রা বিরতি অাছে কিন্তু গন্তব্যের শেষ নেই। হইতো শেষ অাছে কিন্তু গন্তব্য যে অজানা পথে। পথিমধ্যে বিপদসংকুল বন, নদীর ঢেউ অার বানাবনের ইতিহাস। কি অসাধারণ বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। বনবিবির অজানা অধ্যায়, সুন্দরবনের জনজীবন, লোনা পলির গল্প। উপন্যাসের এই ইতিহাস পাঠে অাপনাকে স্বাগতম।
![]() |
| অমিতাভ ঘোষ |
উপন্যাসিক এই উপন্যাসের চরিত্র এবং স্থানের নামকে কাল্পনিক বলেছেন। কিন্তু ইতিহাসকে বলেছেন সত্য। উপন্যাস যেমন ভাবে লেখা হয়েছে তেমন ভাবে একদিন গড়ে উঠেছিলো সেখানকার সমাজ ব্যবস্থা। লেখকের জ্যাঠা মশাই ছিলেন হ্যামিলটনের জমিদারির ম্যানেজার। সেই শোভাতে জানা এই অঞ্চলকে। মূল উপন্যাস অবশ্য ইংরেজি ভাষায় লেখা। কিন্তু সেই ইংরেজি থেকে বাংলা করেছেন অচিন্ত্যরূপ রায়। মজার ব্যাপার হলো এই উপন্যাসের বাংলা করার জন্য অনুবাদককে বহুবার সুন্দরবন ঘুরিয়েছেন লেখক। পরিচয় করেছেন ওখানকার জেলে, শিক্ষক, সাধারণত মানুষদের সাথে। ওখানকার পরিবেশকে দেখিয়েছেন খুব কাছ থেকে। এবং লেখক নিজেও শব্দ অনুচ্ছেদ পরিমার্জিত করেছেন বহুবার। সুতরাং বলা চলে অনুবাদও একটি মূল উপন্যাস। অবশ্য অামার পড়তে কখনো মনে হয়নি এটা অনুবাদ। পড়ার শেষে অনুবাদকের কথা লেখা দেখে চোখ অাটকে গেল। এত সুন্দর উপন্যাস খুব কম পড়া হয়েছে অামার। এতো সুন্দর উপন্যাসের কথা খুব কম লোকে জানে। অার এই উপন্যাসের কথা জানাতে পেরে নিজেকে একজন পাঠক ভাবতে ভালো লাগছে। এ এক ভয়ংকর সুন্দর গল্প।


