গর্ভধারিণী; নতুন পৃথিবী বিনির্মানের গল্প


দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া এই সমাজকে দেখে কখনো সখনো রক্ত গরম হয়ে উঠে। কি হবে এই নষ্ট-পঁচা-গলা সমাজ দিয়ে? খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আর কতদূরই বা যেতে পারবে এই দেশ। মন চাই এক পারমানবিক বোমা ফেঁলে গোটা দেশটাকে শেষ করে দি! আবার নতুন করে গড়ি তুলি পৃথিবীটাকে। কিন্তু থমকে দাঁড়াতে হয় নিজের ক্ষমতা অক্ষমতার যায়গায় এসে। নষ্ট রাজনীতি, নষ্ট সমাজ দেখে হয়তো অনেক যুবকের রক্ত গরম হয়ে উঠে কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ নেই ক জন। গর্ভধারিণী ঐ সব রক্ত গরম হওয়া তরুনদের কাহিনী যারা দেশকে নাড়া দিতে চেয়েছিলো একটুকু সুন্দরের আশাতে। না এ কোন এডভেঞ্চার প্রিয় তরুনদের কার্যকলাপ নয়। গোবরের বুকে পদ্ম ফোটা একদল দেবদূতদের কাহিনী।


উপন্যাস রচনার সময়কাল ১৯৮৬। কেমন ছিল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা? রাজনৈতিক দল গুলো নিজেদের ক্ষমতার লড়ায় নিয়ে কাড়াকাড়িতে মত্ত। বামরা যতই অধিকারের কথা বলুক গদি দখলই তাদের একমাত্র লক্ষ। এলিট শ্রেনি আছে তাদের সুবিধে নিয়ে। মেরুদণ্ড ভাঙ্গা মানুষগুলোর এখন আর কোন কিছুতে ভুরুক্ষেপ হয় না। খেটে খাওয়া মানূষদের কচুকাটা করে ক্ষমতার লড়ায়ে মত্ত দুনিয়াতে আর্বিভিত হয় চার দেবদুত। যারা দেশসেরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী। সামনে উজ্জ্বল ভবিভবিষ্যত রেখে দেশের জন্য, দশের জন্য ঝাপিয়ে পড়া এ এক অমর গাঁথা।


" আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন, মানুষ হইতে হবে এই যার পন "


জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ আর কল্যাণ চার বন্ধু যাদের মন ও মননের  মোটেও উপযোজন ঘটছে না তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার সাথে। তরুণ বয়সের উদ্দীপনা, পরিবর্তনের চেষ্টার যে ব্যাকুলতা তার ছাপ স্পষ্ট চরিত্রগুলোর প্রতি কথোপকথনে, কাহিনীতে। হঠাৎ খুঁজে পাওয়া রেনেসাঁর স্পর্শে সব ভেদাভেদ দূর করার প্রচেষ্টায় মত্ত এই চার তরুণ-তরুণী। সব ভেদাভেদকে ছিন্ন করে ধনী, গরিব, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে যেখানে সবাই এক। কিন্তু এরা যে অঙ্কুরিত হওয়া তরুণ-তরুণী, যারা তারুণ্যের উদ্দীপ্তে পরিবর্তন চায়। এরা তো আর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে পরিপূর্ণ হার-না-মানা বিপ্লবীর মতো না। কিন্তু এরা দৃঢ় প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত বিপ্লবী চেতনায় চলতে থাকে সামনের দিকে পূর্ণ উদ্দেশ্যে। 


কল্যাণ চরিত্রে দেখা যায় নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অভাবে বেড়ে উঠা এক যুবককে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যার কাছে দ্বিধা- দ্বন্দময়। আনন্দ একই সামাজিক কাঠামোতে বেড়ে উঠলেও তার মায়ের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের কারণে তার মাঝে নেতৃত্বের পূর্ণ পরিস্ফুটন ঘটে। অপরদিকে সুদীপ এবং জয়িতা উভয়েই বিত্তবান বাবা মায়ের অবহেলিত সন্তান। উচ্চ শ্রেণির আরাম আয়েশ তাদের কাছে কাটার মতো বিঁধত। জীবনের অর্থ খুঁজতে চার বন্ধু তাই এক অনিশ্চিত পথে পা বাড়ায়। যে পথে লেখক তাদের সঙ্গী। সেই অমর পথের শ্রষ্ঠা সমরেশ বাবু।


জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ আর কল্যাণ এই চার বন্ধুর এক দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প নিয়েই গর্ভধারিণী। ঘূণে ধরা সমাজের বিবেক বোধকে নাড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্য একের পর এক অভিযান চালিয়ে যায় তারা। কিন্তু একসময় চার বন্ধুর প্রয়াস বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। আইনের হাত থেকে বাঁচতে তারা বেরিয়ে পরে। ছুটে যায় হিমালয়ের পাদদেশে পুলিশের নাগালের বাইরে। সেখানে তাদের পরিচয় ঘটে সভ্যতা বর্জিত জনগোষ্ঠীর তাপল্যাঙদের সাথে। এই তাপল্যাঙ দের কে নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এক নতুন সাম্যের সমাজ গড়ে তোলায় চেষ্টায় রত হয়। এই প্রচেষ্টায় আনন্দ গ্রামবাসীকে নেতৃত্ব দেয়। বাকীরা সাহায্য করে। কিন্তু জয়িতার আত্মবিশ্বাস, গ্রামবাসীর সাথে একাত্ব হয়ে যাওয়া এবং সবশেষে সেই গ্রামেরই সন্তানকে পেটে ধরে জয়িতা বাকী বন্ধুদের চেয়ে এগিয়ে যায় অনেক। নিজেকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায় । গর্ভধারিণী নামের স্বার্থকতা এখানেই। 


সমরেশ মজুমদার 


শুধুমাত্র আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট নয়, সমাজের উন্নয়নে দরকার মানসিক ও ব্যক্তিত্যের পরিবর্তন। মূলত বর্তমান সমাজের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে সমাজকে পুনরায় গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে বইটি। সমাজের মানুষগুলোর বিবেকবোধ আর মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে বইটি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে। সমরেশ মজুমদারের এক অসাধারণ কীর্তি গর্ভধারিণী যা বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


কিন্তু বাস্তবতার তুলনায় কাহিনীর বর্ণনাতে আছে একটু বেশিই থ্রিল যেন বাংলা সিনেমার মত। সিনেমাতে নায়কের যেমন মৃত্যু নেই তেমনি উপন্যাসের নায়কের। উপন্যাসের এই অতিরঞ্জিত বর্ণনাই একজন পাঠককে ধরে রাখবে কিন্তু এই অতিরঞ্জিত ভাবই উপন্যাসের দুর্বল দিক। 


এক সময় হয়তো ভুলে যাবে সমাজ তাদের নামগুলো। কিন্তু এই সমাজে তারা যে পদচিহ্ণ এঁকে গেল তা কি রক্ষা করতে পারবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

Previous Post Next Post