কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ফরহাদ মজহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তিনি উন্নয়ন বিকল্প (উবিনীগ) ও নয়াকৃষি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমানে চিন্তা পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে গণঅভ্যুত্থান ও গঠন, মোকাবিলা, এবাদতনামা, সাম্রাজ্যবাদ, মার্কস, ফুকো ও রুহানিয়াত এবং ক্ষমতার বিকার।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনোজগতে যে গভীর পরিবর্তন এনেছে, তা সাহিত্য, দর্শন ও শিক্ষাক্ষেত্রেও স্পষ্ট। সম্প্রতি রাজধানীর রিং-রোডে নিজ বাসভবনে অআকখ-এর তরুণ সাহিত্যানুরাগীদের সঙ্গে এক আড্ডায় এসব বিষয় নিয়েই কথা বলেন ফরহাদ মজহার। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর দৃষ্টিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের নতুন চিন্তার দিক।
অআকখ: সাধারণ জিজ্ঞাসা থেকে শুরু করি, যে কোনো দেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেকে একে সাহিত্যের নবজাগরণও বলে। সাহিত্যের নবজাগরণ বলতে আপনি কি মনে করেন? নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাহিত্যের নবনির্মানের প্রয়োজন অনুভব করেন কিনা?
ফরহাদ মজহার: রাজনৈতিক পরিগঠনের ক্ষেত্রে সাহিত্যের ‘নবজাগরণ’ কথাটি সমাজের সামগ্রিক গতি ও রূপান্তর–বিশেষত রাজনৈতিক কর্তা-সত্তা নির্মাণের দিক থেকে কোন অর্থ জ্ঞাপন করে না। তবে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সাহিত্যের চিন্তাধারা বুঝতে হলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বিষয়টি আগে বুঝতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হলো নতুন ধরনের সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। এই পরিসরগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বটে, কিন্তু আলাদা। তাদের সামষ্টিকভাবে বিচারের পদ্ধতিও আলাদা। গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার বীজ সাহিত্য কীভাবে ধারণ করবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কীভাবে বহন করে নিয়ে যাবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এই জিনিস বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে কী ঘটেছিলো?
গণঅভ্যুত্থান ঘটার পর আবির্ভাব হয় নতুন সূচনার। সেই সূচনার রূপ সাধারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। সেটা বুঝতে পারে দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তবে ধরে নেওয়া হয় যে দার্শনিকরা সবার আগে সেটা ধরতে পারেন। আর সাহিত্য দর্শনের জমিন বটে, কারণ সাহিত্য জনগণের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা, অভিপ্রায় যতোটুকু ধরতে পারে দর্শন তার ওপর দাঁড়ায়। জনগণের ভাষা, কল্পনা, বৃত্তি ও নতুন ভাষা তৈরির মধ্য দিয়ে দর্শনের সহোদর হিশাবে কাজ করে। দর্শন সাহিত্যের ওপরই দাঁড়ায়। যে দেশে সাহিত্য দুর্বল সেই দেশের দর্শন ও চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল।
দেখুন, সাহিত্য দর্শনের অন্তর্গত নয়, কিন্তু দর্শন সাহিত্যেরই একটি শাখা মাত্র। পাঁচ আগস্ট কী ঘটেছিল তা দর্শন এবং রাজনীতির জায়গা থেকে আমার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু সেটা সাহিত্যে পৌঁছাবে কিনা, কীভাবে পৌঁছাবে, কীরূপে পৌঁছাবে তা আমরা এখনো জানি না। আমরা তা আগামী দিনে দেখতে পারবো। আমরা এখনো ততটা সময় অতিবাহিত করিনি।
সাহিত্য তো গণঅভ্যুত্থানে প্রভাব রেখেছে। যেমন: আমার দ্বৈত সত্তা আছে। একটি সত্তা পাঠচক্র করে তরুণদের প্রস্তুত করা, রাজনৈতিক সচেতন করে গড়ে তোলা, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বগুলো তুলে আনা, এগুলো করেছে। আমি সেসব নিয়ে লিখেছি। ২০২৩ সালে আমার বই “গণঅভ্যুত্থান ও গঠন” বের হয়েছিল। সুতরাং তখন থেকে বুঝতে পারছি একটা পরিবর্তন আসছে, আসবেই। বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন গণক্ষমতা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিম্বা তথাকথিত পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের বিপরীত গণসার্বভৌমত্ব এবং তা বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় এসে গিয়েছে। রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তন আসছে। কিন্তু আট আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে বিদ্যমান সংবিধানের ভেতর ঢুকিয়ে প্রতিবিপ্লব ঘটানো হলো। যাকে আমি আমার ভাষায় বলি ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’। সংবিধানের নাম করে, আইনশৃঙ্খলার নাম করে, নিয়মতান্ত্রিকতার নাম করে বিপ্লবকে পুরোনো ব্যবস্থার ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু জনগণের চেতনার ভেতর যদি গণঅভ্যুত্থান ঢুকে গিয়ে থাকে তবে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব দ্বারা তাকে দমন করা যাবে না। দর্শন ও রাজনীতির জায়গা থেকে এটা আমি বুঝি। কিন্তু সাহিত্য কীভাবে, কোন ভাষায়, কী ধরনের রণধ্বনি দ্বারা এই প্রতিবিপ্লব রুখে দেবে সেটা আমি আগাম বলতে পারবো না। জনগণকে অনাগত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাবে সাহিত্য। দমন করতে পারবে না। গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছি। সুতরাং প্রত্যেকে এই ঘটনকে তার মতো করে দেখছে। কেউ সাহিত্যের দিক থেকে, কেউ রাজনীতির জায়গা থেকে, কেউ দর্শনের দিক থেকে। অভিজ্ঞতা ভেদে তার নানান রূপ হবে।
তবে আপনাদের প্রশ্নের ধরণ দেখে বুঝতে পারছি সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এখনো শুরু হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের সময় গল্প-কবিতা লেখা হয়েছে কিন্তু এত বাহ্য! কিন্তু সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার ব্যাপার তা চোখে পড়ছে না। কিন্তু লেখা হবে। গান, কবিতা, গল্প, গ্রাফিতি। এই যে গ্রাফিতি তা তো আগে ছিল না, এটি এখন আমাদের নতুন সাহিত্যের ফর্ম। ফলে আমি সাহিত্যের নবজাগরণ হবে তা বলতে চাই না। এখানে দেখা যাবে একদল গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে লিখে দালালি করবে, অন্য দল বিপক্ষে লিখে দালালি করবে। গণঅভ্যুত্থান সফল করার জন্য লেখার লোক কম পাওয়া যাবে।
সুতরাং নবজাগরণ না বলে বলতে চাই, গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যৎ সাহিত্যে প্রতিফলিত হবার সম্ভাবনা আমি কীভাবে দেখি।
অআকখ: ভবিষ্যৎ সাহিত্যে যে গণঅভ্যুত্থানের প্রকাশ ঘটবে, সেখানে যে সাহিত্যিক চেতনার প্রকাশ ঘটবে তা কি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক প্রক্রিয়া, নাকি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনার ফল?
ফরহাদ মজহার: সাহিত্যিক চেতনা বলতে কী বোঝায়? সাহিত্য সজ্ঞানে কোন মতাদর্শের চেতনা ফেরি করে না, এর মানে এই নয় যে সাহিত্যের কোন বিশেষ মতাদর্শ থাকতে পারে না। অবশ্যই পারে। কিন্তু আগাম তৈরি মতাদর্শ যেন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সাহিত্যকে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। সাহিত্য জেনে বা না জেনে কোনো না কোনো মতাদর্শ বহন করে। নতুন কথা, নতুন চিন্তাও হাজির করে। সমাজের যে চিন্তার আধিপত্য তার ছাপ তো সাহিত্যে থাকবেই, কারণ সাহিত্যিকরা তো সমাজের বাইরের কেউ নন। বড় মাপের সাহিত্যিকরা প্রচলিত চিন্তার গণ্ডি থেকে বের হয়ে যেতে চান। কারণ নতুন চিন্তার জমিন তো সাহিত্যই তৈরি করে। অনেকে ভালো গল্প লিখে, তার লেখায় সাহিত্য থাকবে। যেমন, বালজাক তো ফরাসি বিপ্লবের পক্ষে পুরাপুরি ছিলেন না। কিন্তু মার্কস তাকে পছন্দ করতেন। কারণ তিনি সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে তুলে এনেছিলেন তার লেখায়। বালজাক-এর সাহিত্যকে কার্ল মার্কস গভীর শ্রদ্ধা করতেন। নিয়মিত পড়তেন। বালজাকের “লা কোমেদি হিউমেইন” সিরিজ মার্কসের কাছে শুধু সাহিত্য নয়, ফরাসি সমাজের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অ্যানাটমি ছিল। সে হিশাবেই তিনি পড়েছেন। ১৯শ শতকের ফরাসি দেশে পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছে। উদীয়মান পুঁজিবাদ, মধ্যবিত্তের লোভ, এবং শ্রেণী বৈষম্য বালজাকে নিখুঁতভাবে আঁকা। মার্কস তাঁর “ক্যাপিটাল” গ্রন্থে বালজাকের উল্লেখ করেন। কারণ মুনাফার জন্য মানুষের নৈতিক পতন বালজাক যেভাবে ব্যাখ্যা করেন মার্কসের কাছে সেটা তাঁর অর্থশাস্ত্রীয় তত্ত্বের উপাদান। সামাজিক অবস্থা কীভাবে ব্যক্তির চেতনা ও ভাগ্য নির্ধারণ করে বালজাক তাঁর গল্পে সেটা তুলে ধরেন। “অস্তিত্বই চেতনা নির্ধারণ করে”— মার্কসের এই তত্ত্বের একটা ঔপন্যাসিক বয়ান আমরা বালজাকে পাই। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) সম্পর্কে তাঁর অবস্থান ছিল জটিল। তাঁর রচনায় বিপ্লবের প্রতি সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই প্রকাশ পেয়েছে।
এবার বাংলাদেশের কথায় আসি। হুমায়ূন আমাদের গল্প বলা শিখিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের গল্প নন-পলিটিক্যাল। তার গল্পের কারণে আমাদের বিপ্লব এত দেরিতে ঘটেছে। কারণ হিমু চরিত্র দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি। কিন্তু অনেকে তো হিমুর মতো হতে চেয়েছিল। এখনো চায়। এর মধ্যে একটা দ্রোহ আছে, প্রচলিতকে অস্বীকার করে ভিন্ন জীবন বেছে নেবার দুঃসাহস আছে। কিন্তু সেখানে ব্যক্তি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা প্রধান হয়ে ওঠে। সমাজ বা সমষ্টি নয়। সমাজে সবেমাত্র যখন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটছে তখন ব্যক্তিতান্ত্রিক হিমু স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ব্যক্তিতান্ত্রিক হিমু সমষ্টির মনোগঠন বা সামষ্টিক রাজনৈতিকতা বিকাশের প্রধান ও প্রবল বাধাও বটে।
তাই আমাকে রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে বললে আমি লিখব- “গণঅভ্যুত্থান দেরিতে হওয়ার জন্য দায়ী হুমায়ূন আহমেদ।” তার জন্য হুমায়ূনকে ফেলে দেওয়া যাবে না, বরং নিজেদের বোঝার জন্য তাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পাঠ করা কর্তব্য হয়ে ওঠে।
‘দেরি’ হওয়ার অর্থ মানে হুমায়ূন রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিরোধী ছিল কি?। মোটেও না। দর্শন—বিশেষত রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে হুমায়ূন বরং খুবই ইন্টারেস্টিং। মজার। হিমুকে বুঝতে শিখলে আমরা ব্যক্তিতান্ত্রিক রোমান্টিক পেটি বুর্জোয়াকেও চিনতে ও বুঝতে শিখি। হিমুকে আপন মনে হয়, কারণ এই সেই সময় যখন আমাদের সমাজে ব্যক্তিতান্ত্রিক পেটিবুর্জয়া শ্রেণীর জন্ম হচ্ছে, যে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে না, ব্যতিক্রম হতে চায়, কিন্তু বৃহৎ বদলের জন্য সামষ্টিক কোন উদ্যোগ নিতে অক্ষম কিম্বা বিরোধী। এই হিমু আরামদায়ক। তখন আমরা সকলেই হিমু হয়ে উঠতে চাই। হিমুর মধ্যে নিজেদের আবিষ্কার করি।
হিমু চরিত্রটি প্রতীকী উপস্থাপনা হিশাবে বিচার করা যায়। হিমু “উদ্ভট-উদাসীন-রহস্যময়” চরিত্র। তার আচরণ, দর্শন এবং সমাজ বীক্ষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, নাগরিক জীবনের দ্বন্দ্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সমালোচনা ধরতে পারা যায়। যেমন, হিমুর চরিত্রে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহ সুস্পষ্ট। সে রাষ্ট্র, ধর্ম, বা সামাজিক নিয়মের ধার ধারে না—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি নীরব কিন্তু তীব্র সমালোচনা। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে হিমুর অবস্থান রয়েছে। তাই হিমু কোনো পরিচয়পত্র বহন করে না, চাকরি বা স্থায়ী ঠিকানা প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির প্রতি হিমু প্রশ্ন হিশাবে হাজির। হিমু “নামাজ পড়ে না, কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে”। ধর্মীয় কাঠামোকে হিমু তাহলে চ্যালেঞ্জও করে। সেটা ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কিংবা তার গণবিরোধী রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে হিমু দাঁড়ায়। হিমু অর্থের মোহ প্রত্যাখ্যান করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের পুঁজিবাদী সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ও লোভের রাজনীতিকে হিমু প্রশ্ন করে। হিমুর “অস্থিরতা” এবং “অনিশ্চয়তা”-কে বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের হতাশা ও তীব্র পরিচয় সংকট ও দ্বন্দ্বের—বিশেষত ধর্মীয় বনাম ভাষিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকায়ন হিশাবে পাঠ করা যায়। হিমুর উদাসীন জীবনযাপন বাংলাদেশের পাতিবুর্জোয়ার লোভ ও লালসা কাতর বস্তুতান্ত্রিক জীবন ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রূপও হতে পারে। কিন্তু শেষাবধি হিমুর রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হিমু কোনো সমাধান দেয় না, দিতে পারে না। ঠিক এখানেই তার নাটকীয় জীবন যাপনের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। হিমু শেষাবধি সমাজ ও সামষ্টিক অভিপ্রায় থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিতান্ত্রিক ক্যারিকেচার হয়ে ওঠে, অথচ অনুকরণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রাজনীতি বিমুখ ব্যক্তিতান্ত্রিক পাতিবুর্জোয়া চরিত্র হিশাবে হিমু গণরাজনৈতিক ধারা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রবল বাধা হিশাবে হাজির হয়। কোনো সামষ্টিক অভিপ্রায় তৈরি কিম্বা সমস্যার সামাজিক সমাধানের দিকে হিমু আমাদের নিতে পারে না।
এখানেই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য প্রতিভা। সাহিত্য কী করে সেটা বালজাক পড়ে মার্কস যেমন সমাজকে বুঝেছিলেন, তেমনি এক অর্থে হুমায়ূনের চরিত্রগুলো পাঠ করে আমাদের গণঅভ্যুত্থানের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ণয় করতে হচ্ছে। রাজনীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে ব্যক্তিতান্ত্রিক উপলব্ধিকে সামষ্টিকভাবে করণীয় কর্তব্য হিশাবে সম্পন্ন করব কীভাবে? হিমুকে ফাঁসি দিয়ে? কিম্বা তার অন্তর্ধানকে রহস্যময় রেখে? সমাধানের পথ দেখানো হিমুর দায়িত্ব না। হিমুকে অন্তর্ধান করতেই হবে, কিন্তু রহস্য হয়ে হিমু গল্পের জগতে অমর হয়ে থাকে। পাটিবুর্জোয়ার বিপ্লবীপনা অমর। অতএব হিমুও অমর।
সারা পৃথিবীতে বিরাট বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। বড় বড় সাহিত্যিকরা আসছেন। কিন্তু ১৯৭১-এর পর আমাদের এখানে কোনো বড় কাজ ঘটেনি। কারণ ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা কার্যত মূর্খ ছিল। ‘কার্যত মূর্খ’ কথাটা আমি নিন্দার্থে নয়, সামাজিকভাবে বলছি। এরা পড়েছে শুধু কলকাতার বাংলা বই। অনেকেরই বিদেশি ভাষার সাহিত্য পাঠের হিম্মতও ছিল না। দেশ বিদেশের সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে চলছে তারা। ফলে তাদের সাহিত্যবোধ একান্তই কলোনিয়াল কলকাতা শহরের বাইরে পা বাড়াতে শেখেনি। যে কলকাতা দিল্লির বাইরে নিজেকে স্বাধীনভাবে ভাবতে অক্ষম, সেটা তো স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ হতে পারে না। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ গড়ে উঠল সেটা স্বাধীন দেশ। ঢাকা ফেডারেল সরকারের অধীন কোনো মফস্বল শহর নয়। স্বাধীন শহর। এই স্বাধীন শহরের কোনো উত্তাপ আপনি বাংলাদেশের সাহিত্যে পাবেন না। খুব কম দেখবেন। দর্শন বা কবিতা কীভাবে চিন্তাকে ধারণ করে, চিন্তাকে রসবৃত্তিসহ বদলায় তার কোন খবর বাংলাদেশের সাহিত্য জগৎ রাখে নি।
এই সময়েই মূর্খদের বিখ্যাত সাহিত্যতত্ত্ব তৈরি হয়। সেটা হলো কবিতা বা সাহিত্যে কোন চিন্তা বা রাজনীতি থাকবে না। কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক দীপ্তি থাকবে না। এর ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি পেছনে পড়ে গিয়েছে। শাহবাগ, আজিজ মার্কেটে বসে গল্প করা, ছবির হাটে বসে আড্ডা দেওয়াটাই হয়ে গিয়েছিল সাহিত্যের বিপ্লব। সমাজের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশীলতার বিকাশ ঘটানো সাহিত্যের কাজ। আগেই বলেছি দর্শন সাহিত্যের অন্তর্গত বিষয় বাইরের কোনো শাস্ত্র না। সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে একপ্রকার পারস্পরিকতা আছে বটে, তবে ইতিহাস প্রমাণ করে সমাজ পিছিয়ে থাকলেও কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশীলতার বিকাশ স্ববিরোধী না। এরিস্টটল ও প্লেটো দাস সমাজেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাদের চিন্তায় সেই সমাজের চিহ্ন আছে, সমাজের পশ্চাতপদতা আছে। কিন্তু মৌলিক সাহিত্য রচনা ও চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখবার ক্ষেত্রে তাঁরা তাদের সময়ের চেয়ে হাজার বছর অগ্রসর ছিলেন।
বাংলাদেশের সাহিত্যিক মূর্খতার ভালো লক্ষণ হচ্ছে প্রবল ও প্রকট ইসলাম বিদ্বেষ; সেক্যুলার সাহিত্য চিন্তা সাহিত্য চর্চার আগেই কল্পনা ও ধর্মের জগতের বিপরীতে দাঁড়ায়। অথচ জনমানসের গভীরে ধর্ম বিরাজ করে, মানুষের কল্পনা ও নীতি-নৈতিকতা রূপ লাভ করে ধর্মের ভাষায়। এক শ্রেণীর সাহিত্যিক তৈরি হয়েছে ইসলামের নাম শুনলে তাদের শরীর জ্বালা করে। কথাগুলো আসলে সমাজতত্ত্বের আলোচনার অংশ। কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মতের লোকেরাও তো ভালো সাহিত্য করতে পারে। সে লেখকের যদি কোনো মতবাদ নাও থাকে সেটাও তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। হুমায়ূন যখন সত্তর দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত লিখলো সেটা ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে রিঅ্যাকশনারি পিরিয়ড। হিমু চরিত্র এই সময়কে ধারণ করে। কোন রাজনৈতিক ঘটনার ধারেকাছে হিমু থাকছে না, কিছু করবে না, এগুলো রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভয়ানক ক্ষতিকর। কিন্তু সাহিত্যের বিচারে আপনি একটি বিশেষ সময়ের প্রতীককে ফেলে দিতে পারবেন না। মনে করেন, আমি যদি ভালো শিল্পী হই এবং খারাপ ছবি আঁকি, তবে সেটা বেশি ক্ষতি করবে। হিমু চরিত্রকে অতএব ভাল ভাবেই আঁকতে হবে।
হুমায়ূনের বিপরীতে আপনি কোন লেখকের কথা বলবেন? হুমায়ূন আজাদ তো ভালো সাহিত্যিক না। তার কোন ভালো শক্তিশালী সাহিত্যকর্ম নেই। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তো আসলেই সাহিত্যিক।
হুমায়ূনের একটা গল্প বলি, আধা মনে আছে। একটা ছেলে প্রচুর খেতো। ছেলেটি শেষে মারা গেলো। কিন্তু মারা যাওয়ার পরে দেখা গেলো তার নাভি ছিল না। নাভি মানুষের মধ্যে একজনের ছিল না, সে কে? আদম যখন সৃষ্টি হলেন, তখন কি মায়ের পেট থেকে বের হয়েছিলো? তার নাভি ছিল? দেখেন গল্পের মাঝে মেটাফোর কত পাওয়ারফুল। এগুলো না জানলে আপনি গল্প পড়ে কিচ্ছু বুঝবেন না। যদি আপনি পড়তে না জানেন। কিন্তু আমরা যারা দর্শন করি তারা বিষয়টা বুঝি বা বোঝার চেষ্টা করি।
অআকখ: এই যে একজন লেখক যিনি গল্পের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মেটাফোর তুলে আনলেন। সমসাময়িক সাহিত্যে এমন উপাদান ব্যবহার দেখেন কিনা?
ফরহাদ মজহার: সমসাময়িক এমন কাউকে দেখি না যাকে আমার অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। বা নিজের কোন দর্শন আছে। বা মৌলিক কিছু করছে বলে মনে হয়। ভালো গল্প, কবিতা হয়তো লিখেন, কিন্তু মৌলিক না। কিছু নাম বলেন, তাহলে আমি উত্তর দিতে পারবো।
অআকখ: হরিশংকর জলদাস?
ফরহাদ মজহার: হরিশংকর একটা বিশেষ সম্প্রদায় থেকে এসে তাদের কথা বলেছেন। সামাজিকভাবে তিনি সেই সম্প্রদায়ের কিন্তু সাহিত্যের দিক থেকে তাকালে তেমন চোখে পড়ে না। বা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কি? অদ্বৈত মল্লবর্মণ এর বাইরে নতুন কী করেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
অআকখ: সাদাত হোসাইন বা হাসান রোবায়েত
ফরহাদ মজহার: তারা লিখছেন ভালো, দু একটা বাক্য ভালো। কিন্তু কোন থিম নিয়ে নতুন কোনো কাজ করছেন কি? মানে আপনি লিখছেন যেটা বিশ্বাস করেন বা করেন না সবকিছু। ভাল মানে পাঠকের সাপোর্ট পাওয়ার জন্য শুধু লেখা। যার কোন প্রতিক্রিয়া নাই। তারিফ করা যায়, প্রতিভা আছে। কিন্তু তারপর? নতুনত্ব নেই এদের।
অআকখ: ইমতিয়াজ মাহমুদ
ফরহাদ মজহার: বেটার। নতুনত্ব আছে।
অআকখ: আপনি নিজে মার্কসবাদ, ইসলামি ভাবনা ও অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা নিয়ে দীর্ঘদিন চিন্তা করেছেন। আজকের সাহিত্যচর্চায় মতাদর্শের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
ফরহাদ মজহার: এগুলো অনেক পুরোনো আলোচনা। আজকের দিনে এসব আলোচনা করা মানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। মতবাদ হলো প্রোপাগাণ্ডার মতো। হ্যাঁ, অনেকে লিখছে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে মতাদর্শ এবং সাহিত্য এক নয়। মতাদর্শের আলোচনা সাহিত্যে চলে না। মতাদর্শ দিয়ে সাহিত্যও হয় না। সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো সম্বন্ধ তৈরি করা। কীভাবে সম্বন্ধ তৈরি করে? ভাষা দিয়ে। গল্পে কিছু নেই, কিন্তু ভাষা পড়তে মজা। আবার গল্প বলতে অত্যধিক খারাপ কিন্তু অসাধারণ সাহিত্যিক। আন্তর্জাতিক স্তরের লেখক। বাংলাদেশে এমন কে আছে?
অআকখ: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ। গল্প, বিশেষ করে ছোটগল্পে তিনি অনেক বড় লেখক। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় তো বটে, আন্তর্জাতিক লেভেলের তিনি। ছোটগল্পে। কিন্তু উপন্যাস তাঁর হাতে আসেনি। কিন্তু পড়তে মজা না হলেও ‘চিলেকোঠার সেপাই’ কিংবা ‘খোয়াবনামা’ আন্তর্জাতিক লেবেলের। যেহেতু ১৯৭১ সালের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নতুন একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো দরকার ছিল, এটাই সাহিত্য। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে মার্কসিস্ট মতাদর্শ ছিল। মতাদর্শ যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করা সাহিত্যের জন্য খারাপ কিন্তু ক্রিয়েটিভলি ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতা সকলের থাকে না। তারাশঙ্করের পরে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। নতুন প্রজন্মের যারা লিখবে তাদের আখতারুজ্জামান পড়তে হবে পাঠ্যবইয়ের মতো। মুখস্থ করে করে।
অআকখ: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্?
ফরহাদ মজহার: বেটার, কিন্তু স্বাধীনতার আগের।
অআকখ: শহিদুল জহির?
ফরহাদ মজহার: ভালো কিন্তু সে তো ইলিয়াস ধারার। নতুন নয়।
অআকখ: শাহাদুজ্জামান?
ফরহাদ মজহার: সেও ইলিয়াসকে কপি করেছেন। ঐ ধারাকে। ইলিয়াস রাজনীতি এবং সমাজ সম্পর্কে সচেতন। এবং জীবনবোধ সম্পর্কে সচেতন।
অআকখ: কিন্তু ইলিয়াস তো কাটখোট্টা। বুঝতে কঠিন।
ফরহাদ মজহার: ইউলেসিস, জেমস জয়েস। পড়েছেন?
অআকখ: হ্যাঁ, পড়েছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি অধিকাংশ জিনিস।
ফরহাদ মজহার: আপনি না, অধিকাংশ লোকই বুঝবে না। বোঝে না। ইলিয়াসও তাই। কিন্তু পড়তে হবে, পাঠ্য বইয়ের মতো করে। আগামী দিনের তরুণদের বলবো, আগামীদিনে সাহিত্য করতে হলে, লিখতে হলে অবশ্যই আখতারুজ্জামান পড়তে হবে। তা না হলে আপনি লেখা শিখতে পারবেন না।
অআকখ: আমাদের প্রজন্ম, বয়স আঠারো থেকে ছাব্বিশ। এই প্রজন্মের ভেতর চিন্তা করার প্রবণতা বা সাহিত্যকে সিরিয়াস ভাবার কোন প্রবণতা নেই কেন?
ফরহাদ মজহার: কারণ তারা পড়ে না, লেখে না, সারাদিন ফেসবুক চালায়। ফেসবুক পড়া বন্ধ করে বই পড়ুক।
অআকখ: অনেকে বলেন, অন্যের লেখা পড়লে নিজের স্বতন্ত্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
ফরহাদ মজহার: পৃথিবীর কোনো বড় লেখক সেটা কখনো বলেনি, বলবেও না। পুরোপুরি হাস্যকর। ননসেন্স কথাবার্তা। যারা বলে তারা গর্দভ এবং লেখালেখি পারে না বা বোঝে না।
অআকখ : বাংলাদেশের সাহিত্য কি রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে সংঘর্ষে আছে, নাকি সমঝোতায় আছে?
ফরহাদ মজহার: এটা নির্ভর করছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং ব্যবস্থাপনার ভেতর। নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের সাথে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব আছে, সংঘাত আছে। আপনি কিছু অধিকার ভোগ করেন। কিছু অধিকার হরণ করা হয়, আপনি প্রতিবাদ করবেন। এগুলো সাহিত্যে কীভাবে আসবে তা নির্ভর করছে সময়ের উপর। এর জন্য বুঝতে হবে নাগরিক কীভাবে রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করে। রাষ্ট্র একটা বিমূর্ত ধারণা। আখতারুজ্জামানের একটা গল্প আছে, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এটাও রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া। এটা বুঝতে হলে আপনাকে রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ’ বা উদ্দেশ্যহীন যাত্রার মানে বুঝতে হবে, জানতে হবে। কমল মজুমদারকে কে পড়েছেন?
অআকখ: সবাই না, কিন্তু পড়েছি। গোলাপ সুন্দরী।
ফরহাদ মজহার: কমল কুমার মজুমদার আপনাকে পড়তে হবে। জানতে হবে। এগুলো ক্লাসিক। রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে। এনারা কিন্তু চর্চা করেছেন। ওনারা ভলতেয়ার পড়েছেন। লেখা তো একটা আর্ট, এটা শিখতে হবে। যে বলে অন্যের লেখা পড়তে হবে না তারা বোকা। এগুলো তরুণদের মাথায় কোথা থেকে ঢোকে! মানে এগুলো যারা বলে, আমার আলোচনার কিছু তারা বুঝবে না। সাহিত্যের ভাষা, রাজনীতি কিচ্ছু বুঝবে না। আপনি আল মাহমুদ কিংবা শামসুর রহমান-এর কথা যদি বলেন, এনারা তো প্রচুর পড়েছেন।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের কথা ধরুন। তিনি শ্রীচৈতন্যের জীবনী লিখেছেন, যেটা আবার দর্শনের বই। এমন কেউ লিখতে পারবে? নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে হবে আপনাকে। তা না হলে কি সাহিত্য করবেন আপনি?
ধরেন, আপনি হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। কেউ পারবে এমনভাবে লিখতে যেখানে পুরো উপন্যাস হবে সেক্যুলার। কিন্তু ফিলোসফিকালি সমৃদ্ধ? রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ষোল তখন ‘ভানু সিংহের পদাবলি’ লিখেছিলেন। কারণ তিনি বিদ্যাপতি পড়েছিলেন। এরা কারা, যারা বলে লিখতে হলে পড়তে হবে না? পড়ার গুরুত্ব নেই? রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাপতি মুখস্থ ছিল। যারা এই কথা বলে তারা কখনো লেখকই হতে পারবে না। অনেকটা এরকম যে লিখতে চাই, কিন্তু কীভাবে লিখতে হয় শিখবো না। যারা মনে করে শিল্প সাহিত্যে অন্য লেখকের লেখা পড়া যাবে না, তারা কখনো বড় লেখক হতে পারবে না।
তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন, নিরক্ষর মানুষেরা কীভাবে ভালো সাহিত্য করেন? কিন্তু শ্রুতি কণ্ঠের জগতে ভাবের চর্চা থেকে তাঁরা দূরে থাকতেন না। লালনের সময় তো টেক্সট প্রধান ছিল না, তারা সাধুসঙ্গ করতেন। একে অপরের থেকে জানতেন, বুঝতেন।
অআকখ: সাহিত্য কীভাবে ইতিহাসের পরিবর্তন করতে পারে? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেখেছি পরিবর্তন কিংবা মতাদর্শ নিয়ে বিভেদ, চব্বিশে সেটা কীভাবে কী হবে?
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই পারে। কিন্তু সমাজ থেকে স্মৃতি কখনো চলে যায় না। স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। একাত্তরকে ফিরে দেখা হবে, হবেই। চব্বিশকেও দেখা হবে বিভিন্ন দৃষ্টিতে।
অআকখ: লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন কিংবা ধর্ম, দর্শন সাহিত্য নিয়ে যে লেখালেখি তা রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের সাথে কীভাবে পরিবর্তন ঘটে। বিষয়টা কীভাবে দেখেন?
ফরহাদ মজহার: গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে ২০২৪ সালে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তো আমরা বহু আগে থেকে লেখালেখি করছি। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানে লেখালেখির প্রভাব থাকবে। আমরা লেখালেখির মাধ্যমে জিনিসটা সামনে নিয়ে আসছি। আবার লেখালেখি দিয়ে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসেছে। এখন সাহিত্য বলতে সবাই বোঝে গল্প উপন্যাস। কিন্তু আমার কাছে সেরা সাহিত্যিক হলেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ওরফে লেলিন। নাম শুনেছেন?
অআকখ: নাম কেন শুনব না? তার লেখা বই ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ পড়েছি।
ফরহাদ মজহার: অনেকে আছেন নাম জানেন না। আপনারা পড়েছেন বলেই হয়তো আজ আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
লেনিন বিশ্বাস করতেন, লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করা যায়। লেখা দিয়ে বিপ্লব করা যায়। তাহলে তো লেনিন যে কোন সাহিত্যিকের আইডল হওয়া উচিত। কার্ল মার্কসও তো লিখে সারা পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিলো? যে লিখে, চাইলে সে তো দুনিয়া বদলে দিতে পারে। দেয়ও।
লেখার সাথে মৃত্যুরও সম্পর্ক আছে। কারণ লেখা সবসময় আজরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বী। লেখালিখির মধ্য দিয়ে মানুষ আজরাইলকে টেক্কা দিতে চায়। আজরাইল মানুষকে মারার জন্য বসে থাকে, জানে মেরে ফেলতে চায়। তাই বড় লেখকরা সম্ভবত আজরাইলকে টেবিলের সামনে বসিয়ে রেখে চোখে চোখ রেখে লেখালিখি করেন। আর লেখা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। লেখার মাধ্যমে অনেকে পৃথিবী ওলটপালট করে দিয়েছে। একই সাথে ইতিহাসও বদলে দিয়েছে।
লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কথা বললে আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে একশো বছর এগিয়ে আছি। লেখালেখি, সাহিত্য মানে তো শুধু কে কি লিখলো, কার কি ছন্দ তা নয়। নতুন করে দেশ নির্মাণের চিন্তা করা। আমাদের বাংলাদেশে তো সেটা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বেশি পরিমাণ হচ্ছে। এখন যারা বলে সাহিত্যের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক থাকবে না, সাহিত্যের সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক থাকবে না, সাহিত্যের সাথে সংকল্পের সম্পর্ক থাকবে না : তারা হলো পিওর ইডিয়ট। বিশুদ্ধ ইডিয়ট ছাড়া এগুলো কেও বলতে পারে না। পৃথিবীর বড় বড় চিন্তা এসেছে দর্শন কিংবা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। আমাদের বাংলার চিন্তা অনেক ডেভেলপ। চিন্তার ধারা ফকির লালনে এসে শেষ হয়েছে। তারপর আর ডেভেলপ হয়নি। কিন্তু বিকাশের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।
চিন্তা ছাড়া সমাজ পরিবর্তন সম্ভব কীভাবে? আর সেটা তো লেখালেখি বা সাহিত্যের মাধ্যমে করতে হবে। যেমন ইসলামের সাথে সেক্যুলার মতাদর্শের সম্পর্ক। ধর্মতত্ত্বের চিন্তা সরাসরি চেনা যায় না। তাকে চিনতে জানতে হয়। যেমন, কোরানে আছে গায়েবি আত্মসমর্পণ করতে হবে। ইমান আনতে হবে। কোথায় আনতে হবে? অনুপস্থিতিতের উপর। কেন ইসলাম অনুপস্থিত বিষয়কে এত গুরুত্ব দিচ্ছে? তোমার ‘আমি’-কে সমর্পণ করো, যা নাই তার কাছে। ‘লা ইলাহা’ মানে কি? ‘ইলাহা’ মানে কি? আল্লাহ নেই। আল্লাহ নেই মানে কি নাস্তিকতা? তো আছে কি? ইল্লাল্লাহ। মানে আল্লাহই উপর। লালনের বিখ্যাত একটা গান আছে এ নিয়ে। সেটা হোল যে না বলতে এবং হ্যাঁ বলতে জানে না, সে ধার্মিক না আসলে। হ্যাঁ এবং না এর পার্থক্য বা ভেদবিচার জানা চাই। ইসলামের দর্শন তো শক্তিশালী। অতি উচ্চ স্তরের দর্শন। আল্লাহ ওহি পাঠিয়েছিলো নবীর কাছে। সেই ওহি পরে ব্যাখ্যা হয়েছে, লেখার মাধ্যমে। কুরান তো ব্যাখ্যা করে না, ব্যাখ্যা করি আমরাই। আমরা তো বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, জ্ঞান নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। তাই দিয়ে বিভিন্ন জিনিস ব্যাখ্যা করি। তাহলে ২০২৫ সালে ধর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলে তার সাথে দর্শন নিয়ে কথা বলতে হবে। ব্যাখ্যা করতে গেলেই সাহিত্য চলে আসবে। পাশ্চাত্যে এই লড়াইটা হয়েছিলো। শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম নিয়ে আমাদের সমাজে লড়াই হয় নাই। সেজন্য আমরা চিন্তা করতে ভয় পায়।
ইউরোপে কান্ট এসছে, হেগেল এসছে কিন্তু আমাদের এখানে কে এসেছে? কে এসেছিল তার থেকে বড় প্রশ্ন ইউরোপ ধর্ম এবং দর্শনকে আলাদা করতে পেরেছিলো। তাহলে আমরা পারছি না কেন? এটাই বড় প্রশ্ন।
অআকখ: ধর্ম যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে সেভাবে দর্শন, সাহিত্য কি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছাবে? বা গণ বিস্তার ঘটবে কিনা?
ফরহাদ মজহার: এগুলো ফিলোসোফিকালি অর্ডিনারি প্রশ্ন। সব কিছুর তো গণ বিস্তার প্রয়োজন নেই। সবাই তো চিন্তা করবে না। কেউ কাজ করবে, কেউ চিন্তা করবে। দর্শনের আকুতি তো সব মানুষের আছে। প্রশ্ন তো সবাই করে। দর্শন কিংবা চিন্তা ছাড়া সাহিত্য মরুভূমির মতো। সাহিত্যের মধ্যে সর্বপ্রথম কাব্যই দর্শনকে ধারণ করে। কীভাবে ধারণ করে সেটা বুঝতে হবে, শিখতে হবে, জানতে হবে। বড় চিন্তাবিদ কি বাংলা ভাষায় নেই? যাকে হেগেলের বিপরীতে দাঁড় করানো যায়?
অআকখ: আরজ আলী?
ফরহাদ মজহার: তিনি তো নাস্তিক ছিলেন। শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। নিজস্ব কোনো চিন্তা নেই।
অআকখ: লালন ফকির?
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, তার আগে ছিল শ্রী চৈতন্য। এনাদের একটা লাইন বলো?
অআকখ: এমন মানব জীবন হবে কি ভবে।
ফরহাদ মজহার: শেষ লাইন কি?
অআকখ: শেষ লাইন তো মনে নেই।
ফরহাদ মজহার:
“এই মানুষে হবে মাধুর্য্য ভজন
তাইতে মানবরূপ গঠলেন নিরঞ্জন।”
বা
“অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবরূপের উত্তম কিছুই নাই।”
এর মানে কী? এগুলো সাধারণ গ্রামের মানুষ বুঝে কিন্তু শহরের মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত বোঝে না।
“পাবে সামান্যে কি তার দেখা
বেদে নাই যার রূপরেখা।।”
এর মানে কী? আমরা সারাক্ষণ শুনি এগুলো। কিন্তু মানে বলতে পারি না। এই যে আমাদের প্রত্যেকের নাম এটা হলো সামান্য আর আমরা সবাই মানুষ এটা বিশেষ। লালন বলছে শুধু ‘আল্লাহ’ নামক চিহ্ন দ্বারা তো আল্লাহকে বোঝা যাবে না। এমন অনেক কিছু যা ইউরোপে আলোচনা হয়েছে। ধর্মকে প্রশ্ন করেছে আবার ধর্মও করেছে। তারা ধর্ম ও দর্শন বা উপলব্ধি ও চিন্তাকে আলাদা করতে পেরেছ। আমরা পারিনি, তাই আমাদের নিজস্ব কোন চিন্তা নেই।
সাহিত্য, দর্শন, তত্ত্ব এসবের সাথে সম্পর্ক, আরো কি কি কঠিন কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, এসবের উত্তর হলো আগে চিন্তা করতে শেখো। যখন নিজস্ব চিন্তা হবে তখন সবকিছুই হবে। প্রথম কাজ চিন্তা করতে হবে। আমরা ভাষা ব্যবহার করে কথা বলি কিন্তু চিন্তা করি না। সাহিত্য অতি উঁচু স্তরের আলাপ। সহিত থেকে সাহিত্য। সাহিত্যের কাজ সম্পর্ক স্থাপন করা। সম্বন্ধ তৈরি করা।
এখন বলো রাধারাণী কে?
অআকখ: কৃষ্ণের ভাব সখী। জীবাত্মা।
ফরহাদ মজহার: রাধা তো কৃষ্ণের সাথে প্রেম করতো। কিন্তু তার তো সংসার ছিল। স্বামী ছিল, তাহলে প্রেম করতো কেন? পরকীয়া তো খারাপ কাজ, তাই না? খারাপ কাজ হলে রাধাকে নিয়ে এত উতলা কেন মানুষ তাহলে? এই আলোচনা ধর্ম থেকে নয়, উপলব্ধি ও দর্শন উভয় দিক থেকে বাংলা করে।
রাধা এবং কৃষ্ণ তো প্রেম করছিলো। এখন কৃষ্ণ তো পুরুষের মতো প্রেম করছিলেন রাধার সাথে। রাধা মেয়ের মতো। এখন কৃষ্ণ কি বুঝেছিলো নারী কীভাবে প্রেম করে? কৃষ্ণ তো ভগবান। তাঁর তো সব জানার কথা। দর্শন সেখানে প্রশ্ন করে সে কৃষ্ণ যদি না জানেন যে রাধার প্রেমের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা কেমন তাহলে এই অজ্ঞানতার কারণে তিনি তো নিজেকে ভগবান দাবি করতে পারেন না। যখন জানেন না তখন তো কৃষ্ণ ভগবান না। তাহলে ভগবান হতে হলে কী করতে হবে? শ্রী চৈতন্য হয়ে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এখন ছেলে হয়ে মেয়ের মতো কি প্রেম করতে পারবে? এগুলো ধর্মের কথা না, দর্শনের কথা। ছেলে হয়ে মেয়ের মতো প্রেম করার যে কথা বলা হলো সেটাই হল চৈতন্য। ‘বহিরঙ্গে রাধা, অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ’। চৈতন্যের মধ্যে দুই এক হয়ে বিরাজ করেন।
সাহিত্য করতে হলে ভাষা জানতে হবে, দর্শন জানতে হবে, ধর্ম জানতে হবে।
অআকখ: তাহলে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে কী কী মৌলিক পরিবর্তন দরকার, যেন সেখানে এইসব চর্চার বিষয় থাকে?
ফরহাদ মজহার: এসব যে জানে তাকে শিক্ষা মন্ত্রী করে দাও। আর আমাদের এখানে তো শিক্ষা বলে কিছু নেই, স্কিল ট্রেনিংকে আমরা শিক্ষা বলে চালাই। আমাদের মৌলিক সমস্যা হলো, শিক্ষা বলতে কী বোঝায় তার ধারণা নেই। এই যে তোমরা কয়েক ঘণ্টা ধরে কথা বললে তার ফলে কি শিক্ষা হয়নি? ধরো আলোচনা থেকে যদি কিছু বুঝতে পারো তাহলে তো তোমাদের বয়স বেড়ে এখন একশো। তবে কিছু হোক বা না হোক আজেবাজে বই পড়া থেকে উদ্ধার পাবে নিশ্চয়ই। শিক্ষার প্রথম কাজই আজেবাজে জিনিস পড়া থেকে বিরত থাকা।
যদি তরুণদের মধ্যে কেউ উপন্যাস লিখতে চাও। তিনজন লেখকের বই পড়বে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কমলকুমার মজুমদার।
এগুলো পড়বে। বাংলায় এগুলো হলো বড় লেখা। এরপর তুমি চাইলে প্রয়োজনে অন্য লেখা পড়তে পারো। কিন্তু এগুলো পড়তেই হবে। তুমি চাইলে হালকা বই বা যাকে আজেবাজে বই বলে লোকে তাও পড়তে পারো। সেগুলো আলাদা বিষয়। আমিও অনেক ঠাসঠুস সিনেমা দেখি। এগুলো দেখে মজা লাগে তাই দেখি। কিন্তু আমি আবার প্রস্তুতি নিয়েও সিনেমা দেখি। খাতা-কলম নিয়ে বসে, একা রুমে নিরিবিলি বসে সিনেমা দেখি। তেমন পড়াশোনার বিষয়েও আমি সিরিয়াস। কিছু বই খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। সাহিত্য হলো সিরিযাস বিষয়, অনেক কিছু তার সাথে সম্পর্কিত।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনোজগতে যে গভীর পরিবর্তন এনেছে, তা সাহিত্য, দর্শন ও শিক্ষাক্ষেত্রেও স্পষ্ট। সম্প্রতি রাজধানীর রিং-রোডে নিজ বাসভবনে অআকখ-এর তরুণ সাহিত্যানুরাগীদের সঙ্গে এক আড্ডায় এসব বিষয় নিয়েই কথা বলেন ফরহাদ মজহার। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর দৃষ্টিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের নতুন চিন্তার দিক।
অআকখ: সাধারণ জিজ্ঞাসা থেকে শুরু করি, যে কোনো দেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেকে একে সাহিত্যের নবজাগরণও বলে। সাহিত্যের নবজাগরণ বলতে আপনি কি মনে করেন? নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাহিত্যের নবনির্মানের প্রয়োজন অনুভব করেন কিনা?
ফরহাদ মজহার: রাজনৈতিক পরিগঠনের ক্ষেত্রে সাহিত্যের ‘নবজাগরণ’ কথাটি সমাজের সামগ্রিক গতি ও রূপান্তর–বিশেষত রাজনৈতিক কর্তা-সত্তা নির্মাণের দিক থেকে কোন অর্থ জ্ঞাপন করে না। তবে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সাহিত্যের চিন্তাধারা বুঝতে হলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বিষয়টি আগে বুঝতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হলো নতুন ধরনের সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। এই পরিসরগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বটে, কিন্তু আলাদা। তাদের সামষ্টিকভাবে বিচারের পদ্ধতিও আলাদা। গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার বীজ সাহিত্য কীভাবে ধারণ করবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কীভাবে বহন করে নিয়ে যাবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এই জিনিস বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে কী ঘটেছিলো?
গণঅভ্যুত্থান ঘটার পর আবির্ভাব হয় নতুন সূচনার। সেই সূচনার রূপ সাধারণ জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। সেটা বুঝতে পারে দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তবে ধরে নেওয়া হয় যে দার্শনিকরা সবার আগে সেটা ধরতে পারেন। আর সাহিত্য দর্শনের জমিন বটে, কারণ সাহিত্য জনগণের উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা, অভিপ্রায় যতোটুকু ধরতে পারে দর্শন তার ওপর দাঁড়ায়। জনগণের ভাষা, কল্পনা, বৃত্তি ও নতুন ভাষা তৈরির মধ্য দিয়ে দর্শনের সহোদর হিশাবে কাজ করে। দর্শন সাহিত্যের ওপরই দাঁড়ায়। যে দেশে সাহিত্য দুর্বল সেই দেশের দর্শন ও চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল।
দেখুন, সাহিত্য দর্শনের অন্তর্গত নয়, কিন্তু দর্শন সাহিত্যেরই একটি শাখা মাত্র। পাঁচ আগস্ট কী ঘটেছিল তা দর্শন এবং রাজনীতির জায়গা থেকে আমার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু সেটা সাহিত্যে পৌঁছাবে কিনা, কীভাবে পৌঁছাবে, কীরূপে পৌঁছাবে তা আমরা এখনো জানি না। আমরা তা আগামী দিনে দেখতে পারবো। আমরা এখনো ততটা সময় অতিবাহিত করিনি।
সাহিত্য তো গণঅভ্যুত্থানে প্রভাব রেখেছে। যেমন: আমার দ্বৈত সত্তা আছে। একটি সত্তা পাঠচক্র করে তরুণদের প্রস্তুত করা, রাজনৈতিক সচেতন করে গড়ে তোলা, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বগুলো তুলে আনা, এগুলো করেছে। আমি সেসব নিয়ে লিখেছি। ২০২৩ সালে আমার বই “গণঅভ্যুত্থান ও গঠন” বের হয়েছিল। সুতরাং তখন থেকে বুঝতে পারছি একটা পরিবর্তন আসছে, আসবেই। বিদ্যমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন গণক্ষমতা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কিম্বা তথাকথিত পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের বিপরীত গণসার্বভৌমত্ব এবং তা বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় এসে গিয়েছে। রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তন আসছে। কিন্তু আট আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে বিদ্যমান সংবিধানের ভেতর ঢুকিয়ে প্রতিবিপ্লব ঘটানো হলো। যাকে আমি আমার ভাষায় বলি ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’। সংবিধানের নাম করে, আইনশৃঙ্খলার নাম করে, নিয়মতান্ত্রিকতার নাম করে বিপ্লবকে পুরোনো ব্যবস্থার ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু জনগণের চেতনার ভেতর যদি গণঅভ্যুত্থান ঢুকে গিয়ে থাকে তবে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব দ্বারা তাকে দমন করা যাবে না। দর্শন ও রাজনীতির জায়গা থেকে এটা আমি বুঝি। কিন্তু সাহিত্য কীভাবে, কোন ভাষায়, কী ধরনের রণধ্বনি দ্বারা এই প্রতিবিপ্লব রুখে দেবে সেটা আমি আগাম বলতে পারবো না। জনগণকে অনাগত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাবে সাহিত্য। দমন করতে পারবে না। গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছি। সুতরাং প্রত্যেকে এই ঘটনকে তার মতো করে দেখছে। কেউ সাহিত্যের দিক থেকে, কেউ রাজনীতির জায়গা থেকে, কেউ দর্শনের দিক থেকে। অভিজ্ঞতা ভেদে তার নানান রূপ হবে।
তবে আপনাদের প্রশ্নের ধরণ দেখে বুঝতে পারছি সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এখনো শুরু হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের সময় গল্প-কবিতা লেখা হয়েছে কিন্তু এত বাহ্য! কিন্তু সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার ব্যাপার তা চোখে পড়ছে না। কিন্তু লেখা হবে। গান, কবিতা, গল্প, গ্রাফিতি। এই যে গ্রাফিতি তা তো আগে ছিল না, এটি এখন আমাদের নতুন সাহিত্যের ফর্ম। ফলে আমি সাহিত্যের নবজাগরণ হবে তা বলতে চাই না। এখানে দেখা যাবে একদল গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে লিখে দালালি করবে, অন্য দল বিপক্ষে লিখে দালালি করবে। গণঅভ্যুত্থান সফল করার জন্য লেখার লোক কম পাওয়া যাবে।
সুতরাং নবজাগরণ না বলে বলতে চাই, গণঅভ্যুত্থান ভবিষ্যৎ সাহিত্যে প্রতিফলিত হবার সম্ভাবনা আমি কীভাবে দেখি।
অআকখ: ভবিষ্যৎ সাহিত্যে যে গণঅভ্যুত্থানের প্রকাশ ঘটবে, সেখানে যে সাহিত্যিক চেতনার প্রকাশ ঘটবে তা কি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক প্রক্রিয়া, নাকি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনার ফল?
ফরহাদ মজহার: সাহিত্যিক চেতনা বলতে কী বোঝায়? সাহিত্য সজ্ঞানে কোন মতাদর্শের চেতনা ফেরি করে না, এর মানে এই নয় যে সাহিত্যের কোন বিশেষ মতাদর্শ থাকতে পারে না। অবশ্যই পারে। কিন্তু আগাম তৈরি মতাদর্শ যেন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সাহিত্যকে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। সাহিত্য জেনে বা না জেনে কোনো না কোনো মতাদর্শ বহন করে। নতুন কথা, নতুন চিন্তাও হাজির করে। সমাজের যে চিন্তার আধিপত্য তার ছাপ তো সাহিত্যে থাকবেই, কারণ সাহিত্যিকরা তো সমাজের বাইরের কেউ নন। বড় মাপের সাহিত্যিকরা প্রচলিত চিন্তার গণ্ডি থেকে বের হয়ে যেতে চান। কারণ নতুন চিন্তার জমিন তো সাহিত্যই তৈরি করে। অনেকে ভালো গল্প লিখে, তার লেখায় সাহিত্য থাকবে। যেমন, বালজাক তো ফরাসি বিপ্লবের পক্ষে পুরাপুরি ছিলেন না। কিন্তু মার্কস তাকে পছন্দ করতেন। কারণ তিনি সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে তুলে এনেছিলেন তার লেখায়। বালজাক-এর সাহিত্যকে কার্ল মার্কস গভীর শ্রদ্ধা করতেন। নিয়মিত পড়তেন। বালজাকের “লা কোমেদি হিউমেইন” সিরিজ মার্কসের কাছে শুধু সাহিত্য নয়, ফরাসি সমাজের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অ্যানাটমি ছিল। সে হিশাবেই তিনি পড়েছেন। ১৯শ শতকের ফরাসি দেশে পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছে। উদীয়মান পুঁজিবাদ, মধ্যবিত্তের লোভ, এবং শ্রেণী বৈষম্য বালজাকে নিখুঁতভাবে আঁকা। মার্কস তাঁর “ক্যাপিটাল” গ্রন্থে বালজাকের উল্লেখ করেন। কারণ মুনাফার জন্য মানুষের নৈতিক পতন বালজাক যেভাবে ব্যাখ্যা করেন মার্কসের কাছে সেটা তাঁর অর্থশাস্ত্রীয় তত্ত্বের উপাদান। সামাজিক অবস্থা কীভাবে ব্যক্তির চেতনা ও ভাগ্য নির্ধারণ করে বালজাক তাঁর গল্পে সেটা তুলে ধরেন। “অস্তিত্বই চেতনা নির্ধারণ করে”— মার্কসের এই তত্ত্বের একটা ঔপন্যাসিক বয়ান আমরা বালজাকে পাই। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) সম্পর্কে তাঁর অবস্থান ছিল জটিল। তাঁর রচনায় বিপ্লবের প্রতি সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই প্রকাশ পেয়েছে।
এবার বাংলাদেশের কথায় আসি। হুমায়ূন আমাদের গল্প বলা শিখিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের গল্প নন-পলিটিক্যাল। তার গল্পের কারণে আমাদের বিপ্লব এত দেরিতে ঘটেছে। কারণ হিমু চরিত্র দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটেনি। কিন্তু অনেকে তো হিমুর মতো হতে চেয়েছিল। এখনো চায়। এর মধ্যে একটা দ্রোহ আছে, প্রচলিতকে অস্বীকার করে ভিন্ন জীবন বেছে নেবার দুঃসাহস আছে। কিন্তু সেখানে ব্যক্তি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা প্রধান হয়ে ওঠে। সমাজ বা সমষ্টি নয়। সমাজে সবেমাত্র যখন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটছে তখন ব্যক্তিতান্ত্রিক হিমু স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ব্যক্তিতান্ত্রিক হিমু সমষ্টির মনোগঠন বা সামষ্টিক রাজনৈতিকতা বিকাশের প্রধান ও প্রবল বাধাও বটে।
তাই আমাকে রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে বললে আমি লিখব- “গণঅভ্যুত্থান দেরিতে হওয়ার জন্য দায়ী হুমায়ূন আহমেদ।” তার জন্য হুমায়ূনকে ফেলে দেওয়া যাবে না, বরং নিজেদের বোঝার জন্য তাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পাঠ করা কর্তব্য হয়ে ওঠে।
‘দেরি’ হওয়ার অর্থ মানে হুমায়ূন রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিরোধী ছিল কি?। মোটেও না। দর্শন—বিশেষত রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে হুমায়ূন বরং খুবই ইন্টারেস্টিং। মজার। হিমুকে বুঝতে শিখলে আমরা ব্যক্তিতান্ত্রিক রোমান্টিক পেটি বুর্জোয়াকেও চিনতে ও বুঝতে শিখি। হিমুকে আপন মনে হয়, কারণ এই সেই সময় যখন আমাদের সমাজে ব্যক্তিতান্ত্রিক পেটিবুর্জয়া শ্রেণীর জন্ম হচ্ছে, যে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে না, ব্যতিক্রম হতে চায়, কিন্তু বৃহৎ বদলের জন্য সামষ্টিক কোন উদ্যোগ নিতে অক্ষম কিম্বা বিরোধী। এই হিমু আরামদায়ক। তখন আমরা সকলেই হিমু হয়ে উঠতে চাই। হিমুর মধ্যে নিজেদের আবিষ্কার করি।
হিমু চরিত্রটি প্রতীকী উপস্থাপনা হিশাবে বিচার করা যায়। হিমু “উদ্ভট-উদাসীন-রহস্যময়” চরিত্র। তার আচরণ, দর্শন এবং সমাজ বীক্ষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, নাগরিক জীবনের দ্বন্দ্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সমালোচনা ধরতে পারা যায়। যেমন, হিমুর চরিত্রে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহ সুস্পষ্ট। সে রাষ্ট্র, ধর্ম, বা সামাজিক নিয়মের ধার ধারে না—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি নীরব কিন্তু তীব্র সমালোচনা। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে হিমুর অবস্থান রয়েছে। তাই হিমু কোনো পরিচয়পত্র বহন করে না, চাকরি বা স্থায়ী ঠিকানা প্রত্যাখ্যান করে। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির প্রতি হিমু প্রশ্ন হিশাবে হাজির। হিমু “নামাজ পড়ে না, কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে”। ধর্মীয় কাঠামোকে হিমু তাহলে চ্যালেঞ্জও করে। সেটা ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কিংবা তার গণবিরোধী রাজনৈতিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে হিমু দাঁড়ায়। হিমু অর্থের মোহ প্রত্যাখ্যান করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের পুঁজিবাদী সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ও লোভের রাজনীতিকে হিমু প্রশ্ন করে। হিমুর “অস্থিরতা” এবং “অনিশ্চয়তা”-কে বাংলাদেশের যুদ্ধোত্তর প্রজন্মের হতাশা ও তীব্র পরিচয় সংকট ও দ্বন্দ্বের—বিশেষত ধর্মীয় বনাম ভাষিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকায়ন হিশাবে পাঠ করা যায়। হিমুর উদাসীন জীবনযাপন বাংলাদেশের পাতিবুর্জোয়ার লোভ ও লালসা কাতর বস্তুতান্ত্রিক জীবন ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রূপও হতে পারে। কিন্তু শেষাবধি হিমুর রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হিমু কোনো সমাধান দেয় না, দিতে পারে না। ঠিক এখানেই তার নাটকীয় জীবন যাপনের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। হিমু শেষাবধি সমাজ ও সামষ্টিক অভিপ্রায় থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিতান্ত্রিক ক্যারিকেচার হয়ে ওঠে, অথচ অনুকরণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রাজনীতি বিমুখ ব্যক্তিতান্ত্রিক পাতিবুর্জোয়া চরিত্র হিশাবে হিমু গণরাজনৈতিক ধারা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রবল বাধা হিশাবে হাজির হয়। কোনো সামষ্টিক অভিপ্রায় তৈরি কিম্বা সমস্যার সামাজিক সমাধানের দিকে হিমু আমাদের নিতে পারে না।
এখানেই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য প্রতিভা। সাহিত্য কী করে সেটা বালজাক পড়ে মার্কস যেমন সমাজকে বুঝেছিলেন, তেমনি এক অর্থে হুমায়ূনের চরিত্রগুলো পাঠ করে আমাদের গণঅভ্যুত্থানের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ণয় করতে হচ্ছে। রাজনীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে ব্যক্তিতান্ত্রিক উপলব্ধিকে সামষ্টিকভাবে করণীয় কর্তব্য হিশাবে সম্পন্ন করব কীভাবে? হিমুকে ফাঁসি দিয়ে? কিম্বা তার অন্তর্ধানকে রহস্যময় রেখে? সমাধানের পথ দেখানো হিমুর দায়িত্ব না। হিমুকে অন্তর্ধান করতেই হবে, কিন্তু রহস্য হয়ে হিমু গল্পের জগতে অমর হয়ে থাকে। পাটিবুর্জোয়ার বিপ্লবীপনা অমর। অতএব হিমুও অমর।
সারা পৃথিবীতে বিরাট বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। বড় বড় সাহিত্যিকরা আসছেন। কিন্তু ১৯৭১-এর পর আমাদের এখানে কোনো বড় কাজ ঘটেনি। কারণ ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা কার্যত মূর্খ ছিল। ‘কার্যত মূর্খ’ কথাটা আমি নিন্দার্থে নয়, সামাজিকভাবে বলছি। এরা পড়েছে শুধু কলকাতার বাংলা বই। অনেকেরই বিদেশি ভাষার সাহিত্য পাঠের হিম্মতও ছিল না। দেশ বিদেশের সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে চলছে তারা। ফলে তাদের সাহিত্যবোধ একান্তই কলোনিয়াল কলকাতা শহরের বাইরে পা বাড়াতে শেখেনি। যে কলকাতা দিল্লির বাইরে নিজেকে স্বাধীনভাবে ভাবতে অক্ষম, সেটা তো স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ হতে পারে না। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ গড়ে উঠল সেটা স্বাধীন দেশ। ঢাকা ফেডারেল সরকারের অধীন কোনো মফস্বল শহর নয়। স্বাধীন শহর। এই স্বাধীন শহরের কোনো উত্তাপ আপনি বাংলাদেশের সাহিত্যে পাবেন না। খুব কম দেখবেন। দর্শন বা কবিতা কীভাবে চিন্তাকে ধারণ করে, চিন্তাকে রসবৃত্তিসহ বদলায় তার কোন খবর বাংলাদেশের সাহিত্য জগৎ রাখে নি।
![]() |
| অআকখ'র সাথে আলাপচারিতায় কবি ও চিন্তক ফরহার মজহার |
এই সময়েই মূর্খদের বিখ্যাত সাহিত্যতত্ত্ব তৈরি হয়। সেটা হলো কবিতা বা সাহিত্যে কোন চিন্তা বা রাজনীতি থাকবে না। কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক দীপ্তি থাকবে না। এর ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি পেছনে পড়ে গিয়েছে। শাহবাগ, আজিজ মার্কেটে বসে গল্প করা, ছবির হাটে বসে আড্ডা দেওয়াটাই হয়ে গিয়েছিল সাহিত্যের বিপ্লব। সমাজের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশীলতার বিকাশ ঘটানো সাহিত্যের কাজ। আগেই বলেছি দর্শন সাহিত্যের অন্তর্গত বিষয় বাইরের কোনো শাস্ত্র না। সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে একপ্রকার পারস্পরিকতা আছে বটে, তবে ইতিহাস প্রমাণ করে সমাজ পিছিয়ে থাকলেও কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশীলতার বিকাশ স্ববিরোধী না। এরিস্টটল ও প্লেটো দাস সমাজেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাদের চিন্তায় সেই সমাজের চিহ্ন আছে, সমাজের পশ্চাতপদতা আছে। কিন্তু মৌলিক সাহিত্য রচনা ও চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখবার ক্ষেত্রে তাঁরা তাদের সময়ের চেয়ে হাজার বছর অগ্রসর ছিলেন।
বাংলাদেশের সাহিত্যিক মূর্খতার ভালো লক্ষণ হচ্ছে প্রবল ও প্রকট ইসলাম বিদ্বেষ; সেক্যুলার সাহিত্য চিন্তা সাহিত্য চর্চার আগেই কল্পনা ও ধর্মের জগতের বিপরীতে দাঁড়ায়। অথচ জনমানসের গভীরে ধর্ম বিরাজ করে, মানুষের কল্পনা ও নীতি-নৈতিকতা রূপ লাভ করে ধর্মের ভাষায়। এক শ্রেণীর সাহিত্যিক তৈরি হয়েছে ইসলামের নাম শুনলে তাদের শরীর জ্বালা করে। কথাগুলো আসলে সমাজতত্ত্বের আলোচনার অংশ। কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মতের লোকেরাও তো ভালো সাহিত্য করতে পারে। সে লেখকের যদি কোনো মতবাদ নাও থাকে সেটাও তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। হুমায়ূন যখন সত্তর দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত লিখলো সেটা ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে রিঅ্যাকশনারি পিরিয়ড। হিমু চরিত্র এই সময়কে ধারণ করে। কোন রাজনৈতিক ঘটনার ধারেকাছে হিমু থাকছে না, কিছু করবে না, এগুলো রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভয়ানক ক্ষতিকর। কিন্তু সাহিত্যের বিচারে আপনি একটি বিশেষ সময়ের প্রতীককে ফেলে দিতে পারবেন না। মনে করেন, আমি যদি ভালো শিল্পী হই এবং খারাপ ছবি আঁকি, তবে সেটা বেশি ক্ষতি করবে। হিমু চরিত্রকে অতএব ভাল ভাবেই আঁকতে হবে।
হুমায়ূনের বিপরীতে আপনি কোন লেখকের কথা বলবেন? হুমায়ূন আজাদ তো ভালো সাহিত্যিক না। তার কোন ভালো শক্তিশালী সাহিত্যকর্ম নেই। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তো আসলেই সাহিত্যিক।
হুমায়ূনের একটা গল্প বলি, আধা মনে আছে। একটা ছেলে প্রচুর খেতো। ছেলেটি শেষে মারা গেলো। কিন্তু মারা যাওয়ার পরে দেখা গেলো তার নাভি ছিল না। নাভি মানুষের মধ্যে একজনের ছিল না, সে কে? আদম যখন সৃষ্টি হলেন, তখন কি মায়ের পেট থেকে বের হয়েছিলো? তার নাভি ছিল? দেখেন গল্পের মাঝে মেটাফোর কত পাওয়ারফুল। এগুলো না জানলে আপনি গল্প পড়ে কিচ্ছু বুঝবেন না। যদি আপনি পড়তে না জানেন। কিন্তু আমরা যারা দর্শন করি তারা বিষয়টা বুঝি বা বোঝার চেষ্টা করি।
অআকখ: এই যে একজন লেখক যিনি গল্পের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মেটাফোর তুলে আনলেন। সমসাময়িক সাহিত্যে এমন উপাদান ব্যবহার দেখেন কিনা?
ফরহাদ মজহার: সমসাময়িক এমন কাউকে দেখি না যাকে আমার অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। বা নিজের কোন দর্শন আছে। বা মৌলিক কিছু করছে বলে মনে হয়। ভালো গল্প, কবিতা হয়তো লিখেন, কিন্তু মৌলিক না। কিছু নাম বলেন, তাহলে আমি উত্তর দিতে পারবো।
অআকখ: হরিশংকর জলদাস?
ফরহাদ মজহার: হরিশংকর একটা বিশেষ সম্প্রদায় থেকে এসে তাদের কথা বলেছেন। সামাজিকভাবে তিনি সেই সম্প্রদায়ের কিন্তু সাহিত্যের দিক থেকে তাকালে তেমন চোখে পড়ে না। বা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কি? অদ্বৈত মল্লবর্মণ এর বাইরে নতুন কী করেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
অআকখ: সাদাত হোসাইন বা হাসান রোবায়েত
ফরহাদ মজহার: তারা লিখছেন ভালো, দু একটা বাক্য ভালো। কিন্তু কোন থিম নিয়ে নতুন কোনো কাজ করছেন কি? মানে আপনি লিখছেন যেটা বিশ্বাস করেন বা করেন না সবকিছু। ভাল মানে পাঠকের সাপোর্ট পাওয়ার জন্য শুধু লেখা। যার কোন প্রতিক্রিয়া নাই। তারিফ করা যায়, প্রতিভা আছে। কিন্তু তারপর? নতুনত্ব নেই এদের।
অআকখ: ইমতিয়াজ মাহমুদ
ফরহাদ মজহার: বেটার। নতুনত্ব আছে।
অআকখ: আপনি নিজে মার্কসবাদ, ইসলামি ভাবনা ও অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা নিয়ে দীর্ঘদিন চিন্তা করেছেন। আজকের সাহিত্যচর্চায় মতাদর্শের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
ফরহাদ মজহার: এগুলো অনেক পুরোনো আলোচনা। আজকের দিনে এসব আলোচনা করা মানে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। মতবাদ হলো প্রোপাগাণ্ডার মতো। হ্যাঁ, অনেকে লিখছে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে মতাদর্শ এবং সাহিত্য এক নয়। মতাদর্শের আলোচনা সাহিত্যে চলে না। মতাদর্শ দিয়ে সাহিত্যও হয় না। সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো সম্বন্ধ তৈরি করা। কীভাবে সম্বন্ধ তৈরি করে? ভাষা দিয়ে। গল্পে কিছু নেই, কিন্তু ভাষা পড়তে মজা। আবার গল্প বলতে অত্যধিক খারাপ কিন্তু অসাধারণ সাহিত্যিক। আন্তর্জাতিক স্তরের লেখক। বাংলাদেশে এমন কে আছে?
অআকখ: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ। গল্প, বিশেষ করে ছোটগল্পে তিনি অনেক বড় লেখক। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় তো বটে, আন্তর্জাতিক লেভেলের তিনি। ছোটগল্পে। কিন্তু উপন্যাস তাঁর হাতে আসেনি। কিন্তু পড়তে মজা না হলেও ‘চিলেকোঠার সেপাই’ কিংবা ‘খোয়াবনামা’ আন্তর্জাতিক লেবেলের। যেহেতু ১৯৭১ সালের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নতুন একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো দরকার ছিল, এটাই সাহিত্য। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে মার্কসিস্ট মতাদর্শ ছিল। মতাদর্শ যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করা সাহিত্যের জন্য খারাপ কিন্তু ক্রিয়েটিভলি ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতা সকলের থাকে না। তারাশঙ্করের পরে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। নতুন প্রজন্মের যারা লিখবে তাদের আখতারুজ্জামান পড়তে হবে পাঠ্যবইয়ের মতো। মুখস্থ করে করে।
অআকখ: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্?
ফরহাদ মজহার: বেটার, কিন্তু স্বাধীনতার আগের।
অআকখ: শহিদুল জহির?
ফরহাদ মজহার: ভালো কিন্তু সে তো ইলিয়াস ধারার। নতুন নয়।
অআকখ: শাহাদুজ্জামান?
ফরহাদ মজহার: সেও ইলিয়াসকে কপি করেছেন। ঐ ধারাকে। ইলিয়াস রাজনীতি এবং সমাজ সম্পর্কে সচেতন। এবং জীবনবোধ সম্পর্কে সচেতন।
অআকখ: কিন্তু ইলিয়াস তো কাটখোট্টা। বুঝতে কঠিন।
ফরহাদ মজহার: ইউলেসিস, জেমস জয়েস। পড়েছেন?
অআকখ: হ্যাঁ, পড়েছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি অধিকাংশ জিনিস।
ফরহাদ মজহার: আপনি না, অধিকাংশ লোকই বুঝবে না। বোঝে না। ইলিয়াসও তাই। কিন্তু পড়তে হবে, পাঠ্য বইয়ের মতো করে। আগামী দিনের তরুণদের বলবো, আগামীদিনে সাহিত্য করতে হলে, লিখতে হলে অবশ্যই আখতারুজ্জামান পড়তে হবে। তা না হলে আপনি লেখা শিখতে পারবেন না।
অআকখ: আমাদের প্রজন্ম, বয়স আঠারো থেকে ছাব্বিশ। এই প্রজন্মের ভেতর চিন্তা করার প্রবণতা বা সাহিত্যকে সিরিয়াস ভাবার কোন প্রবণতা নেই কেন?
ফরহাদ মজহার: কারণ তারা পড়ে না, লেখে না, সারাদিন ফেসবুক চালায়। ফেসবুক পড়া বন্ধ করে বই পড়ুক।
অআকখ: অনেকে বলেন, অন্যের লেখা পড়লে নিজের স্বতন্ত্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
ফরহাদ মজহার: পৃথিবীর কোনো বড় লেখক সেটা কখনো বলেনি, বলবেও না। পুরোপুরি হাস্যকর। ননসেন্স কথাবার্তা। যারা বলে তারা গর্দভ এবং লেখালেখি পারে না বা বোঝে না।
অআকখ : বাংলাদেশের সাহিত্য কি রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে সংঘর্ষে আছে, নাকি সমঝোতায় আছে?
ফরহাদ মজহার: এটা নির্ভর করছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং ব্যবস্থাপনার ভেতর। নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের সাথে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব আছে, সংঘাত আছে। আপনি কিছু অধিকার ভোগ করেন। কিছু অধিকার হরণ করা হয়, আপনি প্রতিবাদ করবেন। এগুলো সাহিত্যে কীভাবে আসবে তা নির্ভর করছে সময়ের উপর। এর জন্য বুঝতে হবে নাগরিক কীভাবে রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করে। রাষ্ট্র একটা বিমূর্ত ধারণা। আখতারুজ্জামানের একটা গল্প আছে, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এটাও রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে নেওয়া। এটা বুঝতে হলে আপনাকে রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ’ বা উদ্দেশ্যহীন যাত্রার মানে বুঝতে হবে, জানতে হবে। কমল মজুমদারকে কে পড়েছেন?
অআকখ: সবাই না, কিন্তু পড়েছি। গোলাপ সুন্দরী।
ফরহাদ মজহার: কমল কুমার মজুমদার আপনাকে পড়তে হবে। জানতে হবে। এগুলো ক্লাসিক। রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে। এনারা কিন্তু চর্চা করেছেন। ওনারা ভলতেয়ার পড়েছেন। লেখা তো একটা আর্ট, এটা শিখতে হবে। যে বলে অন্যের লেখা পড়তে হবে না তারা বোকা। এগুলো তরুণদের মাথায় কোথা থেকে ঢোকে! মানে এগুলো যারা বলে, আমার আলোচনার কিছু তারা বুঝবে না। সাহিত্যের ভাষা, রাজনীতি কিচ্ছু বুঝবে না। আপনি আল মাহমুদ কিংবা শামসুর রহমান-এর কথা যদি বলেন, এনারা তো প্রচুর পড়েছেন।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের কথা ধরুন। তিনি শ্রীচৈতন্যের জীবনী লিখেছেন, যেটা আবার দর্শনের বই। এমন কেউ লিখতে পারবে? নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে হবে আপনাকে। তা না হলে কি সাহিত্য করবেন আপনি?
ধরেন, আপনি হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। কেউ পারবে এমনভাবে লিখতে যেখানে পুরো উপন্যাস হবে সেক্যুলার। কিন্তু ফিলোসফিকালি সমৃদ্ধ? রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ষোল তখন ‘ভানু সিংহের পদাবলি’ লিখেছিলেন। কারণ তিনি বিদ্যাপতি পড়েছিলেন। এরা কারা, যারা বলে লিখতে হলে পড়তে হবে না? পড়ার গুরুত্ব নেই? রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাপতি মুখস্থ ছিল। যারা এই কথা বলে তারা কখনো লেখকই হতে পারবে না। অনেকটা এরকম যে লিখতে চাই, কিন্তু কীভাবে লিখতে হয় শিখবো না। যারা মনে করে শিল্প সাহিত্যে অন্য লেখকের লেখা পড়া যাবে না, তারা কখনো বড় লেখক হতে পারবে না।
তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন, নিরক্ষর মানুষেরা কীভাবে ভালো সাহিত্য করেন? কিন্তু শ্রুতি কণ্ঠের জগতে ভাবের চর্চা থেকে তাঁরা দূরে থাকতেন না। লালনের সময় তো টেক্সট প্রধান ছিল না, তারা সাধুসঙ্গ করতেন। একে অপরের থেকে জানতেন, বুঝতেন।
অআকখ: সাহিত্য কীভাবে ইতিহাসের পরিবর্তন করতে পারে? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেখেছি পরিবর্তন কিংবা মতাদর্শ নিয়ে বিভেদ, চব্বিশে সেটা কীভাবে কী হবে?
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই পারে। কিন্তু সমাজ থেকে স্মৃতি কখনো চলে যায় না। স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। একাত্তরকে ফিরে দেখা হবে, হবেই। চব্বিশকেও দেখা হবে বিভিন্ন দৃষ্টিতে।
অআকখ: লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন কিংবা ধর্ম, দর্শন সাহিত্য নিয়ে যে লেখালেখি তা রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের সাথে কীভাবে পরিবর্তন ঘটে। বিষয়টা কীভাবে দেখেন?
ফরহাদ মজহার: গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে ২০২৪ সালে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তো আমরা বহু আগে থেকে লেখালেখি করছি। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানে লেখালেখির প্রভাব থাকবে। আমরা লেখালেখির মাধ্যমে জিনিসটা সামনে নিয়ে আসছি। আবার লেখালেখি দিয়ে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসেছে। এখন সাহিত্য বলতে সবাই বোঝে গল্প উপন্যাস। কিন্তু আমার কাছে সেরা সাহিত্যিক হলেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ওরফে লেলিন। নাম শুনেছেন?
অআকখ: নাম কেন শুনব না? তার লেখা বই ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ পড়েছি।
ফরহাদ মজহার: অনেকে আছেন নাম জানেন না। আপনারা পড়েছেন বলেই হয়তো আজ আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
লেনিন বিশ্বাস করতেন, লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করা যায়। লেখা দিয়ে বিপ্লব করা যায়। তাহলে তো লেনিন যে কোন সাহিত্যিকের আইডল হওয়া উচিত। কার্ল মার্কসও তো লিখে সারা পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিলো? যে লিখে, চাইলে সে তো দুনিয়া বদলে দিতে পারে। দেয়ও।
লেখার সাথে মৃত্যুরও সম্পর্ক আছে। কারণ লেখা সবসময় আজরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বী। লেখালিখির মধ্য দিয়ে মানুষ আজরাইলকে টেক্কা দিতে চায়। আজরাইল মানুষকে মারার জন্য বসে থাকে, জানে মেরে ফেলতে চায়। তাই বড় লেখকরা সম্ভবত আজরাইলকে টেবিলের সামনে বসিয়ে রেখে চোখে চোখ রেখে লেখালিখি করেন। আর লেখা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। লেখার মাধ্যমে অনেকে পৃথিবী ওলটপালট করে দিয়েছে। একই সাথে ইতিহাসও বদলে দিয়েছে।
লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কথা বললে আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে একশো বছর এগিয়ে আছি। লেখালেখি, সাহিত্য মানে তো শুধু কে কি লিখলো, কার কি ছন্দ তা নয়। নতুন করে দেশ নির্মাণের চিন্তা করা। আমাদের বাংলাদেশে তো সেটা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বেশি পরিমাণ হচ্ছে। এখন যারা বলে সাহিত্যের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক থাকবে না, সাহিত্যের সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক থাকবে না, সাহিত্যের সাথে সংকল্পের সম্পর্ক থাকবে না : তারা হলো পিওর ইডিয়ট। বিশুদ্ধ ইডিয়ট ছাড়া এগুলো কেও বলতে পারে না। পৃথিবীর বড় বড় চিন্তা এসেছে দর্শন কিংবা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। আমাদের বাংলার চিন্তা অনেক ডেভেলপ। চিন্তার ধারা ফকির লালনে এসে শেষ হয়েছে। তারপর আর ডেভেলপ হয়নি। কিন্তু বিকাশের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।
চিন্তা ছাড়া সমাজ পরিবর্তন সম্ভব কীভাবে? আর সেটা তো লেখালেখি বা সাহিত্যের মাধ্যমে করতে হবে। যেমন ইসলামের সাথে সেক্যুলার মতাদর্শের সম্পর্ক। ধর্মতত্ত্বের চিন্তা সরাসরি চেনা যায় না। তাকে চিনতে জানতে হয়। যেমন, কোরানে আছে গায়েবি আত্মসমর্পণ করতে হবে। ইমান আনতে হবে। কোথায় আনতে হবে? অনুপস্থিতিতের উপর। কেন ইসলাম অনুপস্থিত বিষয়কে এত গুরুত্ব দিচ্ছে? তোমার ‘আমি’-কে সমর্পণ করো, যা নাই তার কাছে। ‘লা ইলাহা’ মানে কি? ‘ইলাহা’ মানে কি? আল্লাহ নেই। আল্লাহ নেই মানে কি নাস্তিকতা? তো আছে কি? ইল্লাল্লাহ। মানে আল্লাহই উপর। লালনের বিখ্যাত একটা গান আছে এ নিয়ে। সেটা হোল যে না বলতে এবং হ্যাঁ বলতে জানে না, সে ধার্মিক না আসলে। হ্যাঁ এবং না এর পার্থক্য বা ভেদবিচার জানা চাই। ইসলামের দর্শন তো শক্তিশালী। অতি উচ্চ স্তরের দর্শন। আল্লাহ ওহি পাঠিয়েছিলো নবীর কাছে। সেই ওহি পরে ব্যাখ্যা হয়েছে, লেখার মাধ্যমে। কুরান তো ব্যাখ্যা করে না, ব্যাখ্যা করি আমরাই। আমরা তো বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, জ্ঞান নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। তাই দিয়ে বিভিন্ন জিনিস ব্যাখ্যা করি। তাহলে ২০২৫ সালে ধর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলে তার সাথে দর্শন নিয়ে কথা বলতে হবে। ব্যাখ্যা করতে গেলেই সাহিত্য চলে আসবে। পাশ্চাত্যে এই লড়াইটা হয়েছিলো। শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম নিয়ে আমাদের সমাজে লড়াই হয় নাই। সেজন্য আমরা চিন্তা করতে ভয় পায়।
ইউরোপে কান্ট এসছে, হেগেল এসছে কিন্তু আমাদের এখানে কে এসেছে? কে এসেছিল তার থেকে বড় প্রশ্ন ইউরোপ ধর্ম এবং দর্শনকে আলাদা করতে পেরেছিলো। তাহলে আমরা পারছি না কেন? এটাই বড় প্রশ্ন।
অআকখ: ধর্ম যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে সেভাবে দর্শন, সাহিত্য কি সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছাবে? বা গণ বিস্তার ঘটবে কিনা?
ফরহাদ মজহার: এগুলো ফিলোসোফিকালি অর্ডিনারি প্রশ্ন। সব কিছুর তো গণ বিস্তার প্রয়োজন নেই। সবাই তো চিন্তা করবে না। কেউ কাজ করবে, কেউ চিন্তা করবে। দর্শনের আকুতি তো সব মানুষের আছে। প্রশ্ন তো সবাই করে। দর্শন কিংবা চিন্তা ছাড়া সাহিত্য মরুভূমির মতো। সাহিত্যের মধ্যে সর্বপ্রথম কাব্যই দর্শনকে ধারণ করে। কীভাবে ধারণ করে সেটা বুঝতে হবে, শিখতে হবে, জানতে হবে। বড় চিন্তাবিদ কি বাংলা ভাষায় নেই? যাকে হেগেলের বিপরীতে দাঁড় করানো যায়?
অআকখ: আরজ আলী?
ফরহাদ মজহার: তিনি তো নাস্তিক ছিলেন। শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। নিজস্ব কোনো চিন্তা নেই।
অআকখ: লালন ফকির?
ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, তার আগে ছিল শ্রী চৈতন্য। এনাদের একটা লাইন বলো?
অআকখ: এমন মানব জীবন হবে কি ভবে।
ফরহাদ মজহার: শেষ লাইন কি?
অআকখ: শেষ লাইন তো মনে নেই।
ফরহাদ মজহার:
“এই মানুষে হবে মাধুর্য্য ভজন
তাইতে মানবরূপ গঠলেন নিরঞ্জন।”
বা
“অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবরূপের উত্তম কিছুই নাই।”
এর মানে কী? এগুলো সাধারণ গ্রামের মানুষ বুঝে কিন্তু শহরের মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত বোঝে না।
“পাবে সামান্যে কি তার দেখা
বেদে নাই যার রূপরেখা।।”
এর মানে কী? আমরা সারাক্ষণ শুনি এগুলো। কিন্তু মানে বলতে পারি না। এই যে আমাদের প্রত্যেকের নাম এটা হলো সামান্য আর আমরা সবাই মানুষ এটা বিশেষ। লালন বলছে শুধু ‘আল্লাহ’ নামক চিহ্ন দ্বারা তো আল্লাহকে বোঝা যাবে না। এমন অনেক কিছু যা ইউরোপে আলোচনা হয়েছে। ধর্মকে প্রশ্ন করেছে আবার ধর্মও করেছে। তারা ধর্ম ও দর্শন বা উপলব্ধি ও চিন্তাকে আলাদা করতে পেরেছ। আমরা পারিনি, তাই আমাদের নিজস্ব কোন চিন্তা নেই।
সাহিত্য, দর্শন, তত্ত্ব এসবের সাথে সম্পর্ক, আরো কি কি কঠিন কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে, এসবের উত্তর হলো আগে চিন্তা করতে শেখো। যখন নিজস্ব চিন্তা হবে তখন সবকিছুই হবে। প্রথম কাজ চিন্তা করতে হবে। আমরা ভাষা ব্যবহার করে কথা বলি কিন্তু চিন্তা করি না। সাহিত্য অতি উঁচু স্তরের আলাপ। সহিত থেকে সাহিত্য। সাহিত্যের কাজ সম্পর্ক স্থাপন করা। সম্বন্ধ তৈরি করা।
এখন বলো রাধারাণী কে?
অআকখ: কৃষ্ণের ভাব সখী। জীবাত্মা।
ফরহাদ মজহার: রাধা তো কৃষ্ণের সাথে প্রেম করতো। কিন্তু তার তো সংসার ছিল। স্বামী ছিল, তাহলে প্রেম করতো কেন? পরকীয়া তো খারাপ কাজ, তাই না? খারাপ কাজ হলে রাধাকে নিয়ে এত উতলা কেন মানুষ তাহলে? এই আলোচনা ধর্ম থেকে নয়, উপলব্ধি ও দর্শন উভয় দিক থেকে বাংলা করে।
রাধা এবং কৃষ্ণ তো প্রেম করছিলো। এখন কৃষ্ণ তো পুরুষের মতো প্রেম করছিলেন রাধার সাথে। রাধা মেয়ের মতো। এখন কৃষ্ণ কি বুঝেছিলো নারী কীভাবে প্রেম করে? কৃষ্ণ তো ভগবান। তাঁর তো সব জানার কথা। দর্শন সেখানে প্রশ্ন করে সে কৃষ্ণ যদি না জানেন যে রাধার প্রেমের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা কেমন তাহলে এই অজ্ঞানতার কারণে তিনি তো নিজেকে ভগবান দাবি করতে পারেন না। যখন জানেন না তখন তো কৃষ্ণ ভগবান না। তাহলে ভগবান হতে হলে কী করতে হবে? শ্রী চৈতন্য হয়ে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এখন ছেলে হয়ে মেয়ের মতো কি প্রেম করতে পারবে? এগুলো ধর্মের কথা না, দর্শনের কথা। ছেলে হয়ে মেয়ের মতো প্রেম করার যে কথা বলা হলো সেটাই হল চৈতন্য। ‘বহিরঙ্গে রাধা, অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ’। চৈতন্যের মধ্যে দুই এক হয়ে বিরাজ করেন।
সাহিত্য করতে হলে ভাষা জানতে হবে, দর্শন জানতে হবে, ধর্ম জানতে হবে।
অআকখ: তাহলে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে কী কী মৌলিক পরিবর্তন দরকার, যেন সেখানে এইসব চর্চার বিষয় থাকে?
ফরহাদ মজহার: এসব যে জানে তাকে শিক্ষা মন্ত্রী করে দাও। আর আমাদের এখানে তো শিক্ষা বলে কিছু নেই, স্কিল ট্রেনিংকে আমরা শিক্ষা বলে চালাই। আমাদের মৌলিক সমস্যা হলো, শিক্ষা বলতে কী বোঝায় তার ধারণা নেই। এই যে তোমরা কয়েক ঘণ্টা ধরে কথা বললে তার ফলে কি শিক্ষা হয়নি? ধরো আলোচনা থেকে যদি কিছু বুঝতে পারো তাহলে তো তোমাদের বয়স বেড়ে এখন একশো। তবে কিছু হোক বা না হোক আজেবাজে বই পড়া থেকে উদ্ধার পাবে নিশ্চয়ই। শিক্ষার প্রথম কাজই আজেবাজে জিনিস পড়া থেকে বিরত থাকা।
যদি তরুণদের মধ্যে কেউ উপন্যাস লিখতে চাও। তিনজন লেখকের বই পড়বে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কমলকুমার মজুমদার।
এগুলো পড়বে। বাংলায় এগুলো হলো বড় লেখা। এরপর তুমি চাইলে প্রয়োজনে অন্য লেখা পড়তে পারো। কিন্তু এগুলো পড়তেই হবে। তুমি চাইলে হালকা বই বা যাকে আজেবাজে বই বলে লোকে তাও পড়তে পারো। সেগুলো আলাদা বিষয়। আমিও অনেক ঠাসঠুস সিনেমা দেখি। এগুলো দেখে মজা লাগে তাই দেখি। কিন্তু আমি আবার প্রস্তুতি নিয়েও সিনেমা দেখি। খাতা-কলম নিয়ে বসে, একা রুমে নিরিবিলি বসে সিনেমা দেখি। তেমন পড়াশোনার বিষয়েও আমি সিরিয়াস। কিছু বই খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। সাহিত্য হলো সিরিযাস বিষয়, অনেক কিছু তার সাথে সম্পর্কিত।
