চট করে করে দাঁড়িয়ে গেল অটোরিকশা। ঝাঁকি খেয়ে, পেছনের চিকন রডের সঙ্গে হাতে ঠেকা দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারল সে।
‘সরি আপা, আপনি আঘাত পেলেন!’
সুন্দর উচ্চারণে ‘সরি’ শব্দটা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল পুষ্প।
বিনয়ের সুরে বলল, ‘দোষটা তো আমার। আমারই আপনাকে সরি বলা উচিত অথচ বললেন আপনি!’
তরুণ চালক অটো থেকে নেমে বলল, ‘মনে হলো আপনি আসাদগেট এর ব্যাপারে কৌতূহলী! আপনার কৌতূহলের মান রাখা উচিত। তা ছাড়া আপনার ব্যক্তিগত মর্যাদাকে বেশি মূল্যবান মনে করেছি আমি।’
‘কেন এমন মনে হলো?’
‘তা জানি না। তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আপনার স্লোগানমুখর কণ্ঠ আর মুখ ভাইরাল হয়েছিল। তা দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আপনার মুখটা আমার অনেক চেনা। সেই মানুষটার ইচ্ছাপূরণ করব না? কি বলেন, আপা?’
‘আপনি যে সুন্দর করে কথা বলছেন, দেখে-শুনে মনে হচ্ছে পড়াশোনাও করেছেন। শিক্ষিতই আপনি। ঠিক কি না?’
তরুণের মাথা নত হয়ে গেল। আরও বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, ‘আমি মাস্টার্স করেছি, হিস্ট্রিতে।’
প্রবল একটা ধাক্কা খেল পুষ্প।
কী বলবে ভাষা খুঁজে পেল না। ‘আমরা তো বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রসংস্কারের কাজ করতে চেয়েছিলাম। বেকারত্ব দূর করতে চেয়েছি। মেধাবীরা যেন যোগ্য চাকরি পায় তার জন্য প্রায় এক হাজারের মতো তরুণ জীবন দিয়েছে, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আহত হয়ে এখনও কাতরাচ্ছে! আর আপনারা বেকার!’
‘বেকার না। আমি নিজেই উদ্যোক্তা, আন্দোলনের আগে থেকেই। এই অটো কিনেছি বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে। এখন এটা চালিয়ে সংসার চলে যাচ্ছে ভালোভাবে।’
‘তাই বলে অটো চালাবেন?’
‘আপা, বিশ্বের সব দেশে গিয়ে দেখেন আমাদের ছেলেরা টেক্সিক্যাব চালায়। হোটেল-মোটেলে বয় হিসেবে কাজ করে, মেয়েরাও। শ্রম তো শ্রমই। শ্রমের মর্যাদা তুচ্ছ নয়।’
দমে গেল পুষ্প। আসাদগেট সম্পর্কে কিছু একটা জানতে চেয়েও থেমে গেল। সুযোগ পেয়ে তরুণ চালক বলল, ‘বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছিলাম প্রিলি, লিখিত এবং ভাইভাতেও ভালো করেছিলাম। পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে দিয়েছে। কারণ আমার দাদা পাকিস্তানিদের পক্ষে কাজ করেছিল। তারা চায়নি পাকিস্তান ভেঙে যাক। এটাই হলো আমার অযোগ্যতা। মেধা থাকা সত্ত্বেও দাদার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশন খারাপ হয়ে যায়। চাকরি হয়নি। তাই নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছি।’
‘বাহ। আপনাকে শ্রদ্ধা জানাই। অথচ মেধার সমতা পাওয়ার জন্য ছাত্রসমাজ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় এক হয়ে গেছে।’
‘শুধু মেধার বঞ্চনা এটা নয়। রাজনৈতিক-কোটা বিলোপের কথা বলেননি আপনারা। পূর্বের সরকারগুলো যখন ক্ষমতার মসনদে ছিল তখন নিজের লেজুড় ছাত্রসংগঠনকারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে গেছে। সেই কোটার হার দৃশ্যমান মেধার বঞ্চনা থেকেও অনেক বেশি ছিল।’
পুষ্প অবাক হয়ে তাকাল অটোচালকের মুখের দিকে। দেখল তার চোখে বিষাদ আর ক্ষোভের যুগল প্রতিচিত্র। অথচ খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে কথা বলছেন। তাকে আর কেবল অটোচালক ভাবতে পারল না। গুণী মানুষ হিসেবে মনের দরজায় টোকা দিল। দেখল যুবকের মুখ থেকে অন্য আলো ছড়িয়ে যচ্ছে। অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চালক বলল, ‘আপা এখানে নেমেছেন কেন? কিছু একটা উদ্দেশ্য নিয়ে কি এমন আচমকা অটো থামাতে বলেছেন?’
বাস্তবে ফিরে এল পুষ্প। ইতিহাসের ছাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টা চট করে টোকা দেওয়ায় বলল, ‘আসাদ নিহত হয়েছিল উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময়, ঊনসত্তরের গণ-জোয়ারের সময়। হঠাৎ মনে হলো আসাদগেটটা দেখি। ইতিহাসের বাস্তব নিদর্শন থেকে ইতিহাস খুঁজে নিই।’
“জি, আপা। ঠিক বলেছেন, ১৯৬৯ সালে ২০ জানুয়ারি আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। পরদিন ঢাকায় জনতার শোক মিছিল নামে। শহীদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে এখানে এসে হাজির হয় শোকাহত জনতা। এই যে পূর্বদিকে জাতীয় সংসদ ভবন। এখান থেকে ওই সড়কটা মোহাম্মদপুরে চলে গেছে। এই গেটের আগের নাম ছিল আইয়ুব গেট, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির নামে এই নামকরণ করা হয়েছিল। প্রতিবাদী জনসমুদ্র আইয়ুব খানের নামফলক গুঁড়িয়ে দিয়ে রক্ত দিয়ে লেখেন ‘আসাদ গেট’। সেই থেকে এটা আন্দোলনের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদাহরণ হয়ে টিকে আছে। আসাদ ইতিহাসের অমর ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন দেশের আপমর জনতার মননে। রাজনৈতিক বিভাজন নেই তাঁকে নিয়ে। অথচ বড় নেতা হলেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভাজন আছে। বিদ্বেষ আছে। এজন্য বিজয়ের পর ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তাঁর সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে। ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িও আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। যদিও আন্দোলনের পর ওই ঐতিহাসিক বাড়ি পোড়ানো হবে তা জানতাম না আমরা।”
সব কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল পুষ্প। গেটের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর কাঁপন টের পেল। কী সেই কাঁপন বুঝতে পারল না। পুষ্পর অন্যমনষ্ক মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অটোচালক বলে বসল, ‘আপনাকে এই মুহূর্তে অন্য রকম লাগছে। কিছু নিয়ে কি আপনি চিন্তিত?’
বাস্তবে ফিরে এসে পুষ্প তাৎক্ষণিক জবাব দিল, ‘না। না। ঠিক আছি।’
‘না, আপা ঠিক নেই। মনে হলো আপনি কিছু একটা বলতে চাচ্ছেন, পারছেন না।’
মাথা উঁচু করে যুবকের দিকে তাকিয়ে পুষ্প এবার সহজ কণ্ঠে বলল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করছে আসাদগেটটা একটু ছুঁয়ে দেখতে। হেল্প করবেন?’
পুষ্পর কোমল অনুভূতি বুঝতে অসুবিধা হলো না। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘শিওর। আসুন।’
পুষ্প এগিয়ে গেল।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে হাত রাখল গেটের সিমেন্টের স্তম্ভে।
অপূর্ব অনুভূতি ছড়িয়ে যেতে লাগল। অনন্য এক গাছ, সবুজ পাতায় ভরা, জড়িয়ে রেখেছে গেট। যেন জড়িয়ে ছায়া দিচ্ছে গেটের পাষাণস্তম্ভের ইট-সুরকি-সিমেন্ট ভেদ করে চিরজাগরুক হয়ে থাকা আসাদকে।
নতুন অনুভবে ঋদ্ধ হয়ে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে, প্রায় মধ্য আকাশে উঠে আসা সূর্যের আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিল। আর তখনই ও শুনল, অন্তর ভেদ করে জেগে ওঠা প্রশ্ন, ‘হাত সরিয়ে নিলে কেন? আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখো?’
‘কে? কে?’ অনুচ্চারিত দুটা প্রশ্নবোধক শব্দ বেরিয়ে এল ওর আত্মা ফালা ফালা করে দিয়ে।
‘ভয় পেয়ো না। আমি ফারহান!’
‘তুমি! তুমি আসাদ গেটে কী করছ?’
‘ছেলেবেলা থেকে আসাদের বীরত্বগাথা আমার অন্তরে ঢুকে ছিল। মস্তিষ্কে আসন নিয়েছিল। তাঁর মতো সাহসী হওয়ার ইচ্ছে ছিল। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরও। তো তুমি আসাদ গেটে এসেছ, আর আমি জেগে উঠব না তোমার মনে!’
‘তোমার সে ইচ্ছা কি পূরণ হয়েছে?’
‘হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি। কীভাবে কীভাবে যেন হয়ে গেছে। সেই যে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় ছাত্ররা বেদম মার খেলো, সরকারের লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডারা আমাদের যেভাবে পেটাল, তুমিও তো ছিলে তখন থেকে আমাদের পথের পথিক! ভুলে গেছ? তখন থেকে আমার ভেতরের সত্তা, আসাদ থেকে পাওয়া, আমার আমি জেগে উঠি। তারপর তো মেধার প্রশ্নে আমরা এক হয়ে লড়াইয়ে নেমে গেলাম। পার্থক্য হচ্ছে তুমি আছো জীবনসমুদ্রের পাড়ে আর আমি ওপারে, আত্মার বিচরণভূমে, সৌরজগতের তারকারশ্মির মধ্যে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো গণ-আন্দোলনে নিহত হলেও তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি!’
‘কীভাবে বুঝলে যে বিচ্ছিন্ন হওনি?’
‘রক্তমাংসের দেহজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। আত্ম থেকে হইনি। এখন তুমি কী উদ্দেশ্য বাসা থেকে বেরিয়েছ, এখানে কেন দাঁড়িয়েছ, কেন আসাদ গেটে হাত রেখে স্পর্শ করলে, তোমার অতল তলের সেই অজানা ইচ্ছাটা আমি জেনে ফেলেছি। দেখে ফেলেছি। তবু বলবে দেহজগতে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি?’
‘আপা, কী ভাবছেন? যাবেন না?’
অটোচালকের প্রশ্ন শুনে চমকে উঠে পুষ্প বলল, ‘হ্যাঁ। চলুন।’
সড়কের ওপাশে কিছুটা ভেতরের গলিতে দাঁড় করানো অটোয় ফিরে এল দুজন। অটো চলতে শুরু করেছে। চলমান জীবনের সময় এভাবে ছুটে যায় সামনে। রেখে যায় সময়ের চিহ্ন। কিছু কিছু অমর চিহ্ন গেঁথে থাকে সময়ের শীর্ষবিন্দুতে।
‘আপা এসে গেছি? এখানেই নামবেন?’
পুষ্প বাঁয়ে তাকালে এবার, মাথা উঁচু করেই তাকাতে হলো। সূর্য এখন মাথার ওপর। সূর্যের আলোর ঢল নেমেছে বাঁয়ে। পুষ্প দেখল পাথর খোদাই করে লেখা : রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ, তার নিচে ভিন্ন ফন্টে সুন্দর করে লেখা : ‘শহিদ ফারহান ফাইয়াজ গেইট’।
‘কী দেখছ, পুষ্প?’
‘কে, কে এখন প্রশ্ন করলেন?’
‘আমি রবি, তোমাদের রবিকবি। তোমার প্রিয় ‘গল্পগুচ্ছে’র লেখক। আমার গল্প পড়তে পড়তে তুমি আমাকে তোমার ব্রেনের কোষের ভেতর আসন দিয়েছ। তোমার কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছি আমি।’
ভেতরের ভেতর থেকে প্রশ্ন ও কথা শুনে চমকে উঠেও চোখ সরিয়ে না-নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তাহলে দেখছ না, কী দেখছি, আমি?’
‘দেখছ আন্দোলনে নিহত তোমার সাথী ফারহানের নাম।’
‘তো প্রশ্ন করলে কেন?’
‘কেবল বর্ণমালায় সাজানো নামটা দেখলে হবে? নামের ভেতরে যে আরেকটা নাম লুকিয়ে আছে তা কি দেখতে পেয়েছ? ফাইয়াজ অর্থ বুঝেছ? আর তার নামের যে দুটো অংশ আছে আগে তা খেয়াল করেছ?’
মনে একটা ধাক্কা খেল পুষ্প। নরম হয়ে গেল ওর চাউনি, চোখ সরিয়ে নিয়ে অনুভব করতে লাগল কেবল ‘ফারহান’ নামেই জুলাইয়ের আন্দোলনের শহিদ হিসেবে সে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ‘ফাইয়াজ’ নামটা শুনেছিল, তবে মনে স্থায়ী হয়ে ছিল না। এখন শব্দটা আরও গেঁথে গেল চোখের মনি ভেদ করে নিউরনের প্রোটন কণার ভেতরে। সহজ হয়ে বলল, “নামের ভেতর আরেকটা নাম নেই। দুটো শব্দ জোড় বেঁধে ওর একটাই নাম ‘ফারহান ফাইয়াজ’।”
‘শোনো, ফারহান একটা আরবি শব্দ। যার অর্থ সুখী, আনন্দময়, প্রফুল্ল। ফারাহ সাধারণত মেয়েদের নাম হয়, অর্থ সুখ। আর ফারহান ছেলেদের নাম―একটি অর্থময় শব্দ, জোরালোভাব প্রকাশ করে তার ব্যক্তিত্ব। তার ভেতর লুকিয়ে থাকে সুখ, ভাগ্য আর সমৃদ্ধি।’
‘ও। নামের সঙ্গে ওর ভাগ্যের এমন বেমানান মিল!’
‘বেমানান বলছ কেন? ও তো ইতিহাসের সৌভাগ্যের তিলক স্পর্শ করে ফেলেছে।’
‘তা করেছে। তবে ওর স্বজন আর অনুরাগীদের বুকে যে বিষবান ঢুকিয়ে দিয়ে গেল! তার দায় কার?’
‘তার দায় মেধার বৈষম্য সৃষ্টিকারী সরকারের আর সহিংস রাজনীতির। ছাত্র-ছাত্রীদের মনের দাবি বুঝতে না-পারার ব্যর্থতা, খুনিদের নির্মমতা। তাঁর বা তাঁদের মৃত্যুর ভেতর থেকে ইতিহাস শিক্ষা নেবে। এই শিক্ষা হবে ইতিহাস থেকে পাওয়া সম্পদ। আর ওর নামের প্রথম অংশের ভেতরে কী গৌরব লুকিয়ে আছে, টের পাচ্ছ?’
শুধু টের পেল না, সে যেন নতুনভাবে জেগে উঠল জীবনানন্দ দাশের বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ থেকে। মনে মনে আওড়াল, ‘থাকে শুধু আলো, মুখোমুখি বসিবার, ফাইয়াজ ফারহান।’
‘বাহ! জীবনান্দ দাশের পঙ্ক্তিকে প্যারোডি বানিয়ে ভালোই তো অনুভব করলে!’
‘তোমার হিংসে হলো?’
“না। মোটেও না। বরং তোমার কাব্যময় মন কেবল আমারই গল্প-কবিতা চষে বেড়ায় না। আমার অনুজ কবিদের মনও এটা আমারও আনন্দ। আন্দোলনের সময় তোমরা নজরুলের ‘ভাঙার গান’ গেয়ে দুর্বিনীত ক্ষমতার মসনদ ভেঙে দিয়েছ। আর এখন প্রশান্তির মুহূর্তে জীবনানন্দকে অনুভব করেছ। কবি হিসেবে, এটা আমার আনন্দই। আমার প্রাণেও স্পন্দন ওঠে ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ শুনে।”
‘এজন্যই তুমি বড় কবি, অন্তর্ভেদী কবি। তো ফারহানের নামের বাকি অংশের অর্থ কী? তা তো এড়িয়ে যাচ্ছ?’
‘এড়িয়ে যাইনি। তুমিই নিজের অজান্তে ফারহানকে আবিষ্কার করেছ চাঁদের দেশে। তার নামের আরেকটা অর্থ চাঁদের চিহ্ন। সেই চিহ্ন তো অমলিন, তাই না? তোমার বুকে আর মাথায় অর্থাৎ তোমার আবেগ আর চিন্তায় সিল মেরে বসে গেছে সে। অস্বীকার করবে?’
নত হয়ে গেল পুষ্প। চুপ করে আছে।
রবি-কবি আবার বললেন, ‘সে বা তারা দেশটাকে সংস্কারের সুযোগ করে দিয়ে গেছে, ঊনসত্তরের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চেয়ে ব্যাপক আর বেশি জোরালো ছিল চব্বিশের আন্দোলন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাদে সব চেয়ে বেশি শহিদও হয়েছে এ সময়। সামনের সব সরকারকে মনে রাখতে হবে কথাটা। যে সরকারই ক্ষমতার বসুক, তারা সতর্ক থাকবে, অপকর্ম আর দুঃশাসন থেকে দূরে থাকবে। সেটা কি দেশের জন্য কম উপহার? কম উৎসর্গ? কম দান?’
‘ঠিক। তবে এ প্রসঙ্গে টানলে কেন? এটা তো জানাই আছে আমার।’
‘অবশ্যই জানা আছে তোমাদের তবে ফাইয়াজ নামের অর্থ জানা নেই মনে হলো। এজন্য আমার কথার অর্থ ধরতে পারোনি।’
‘তুমি তো নানা রূপক-উপমা মিশিয়ে কথা বলো, তোমার পঙ্ক্তিতে তো ভরা থাকে নানা চিত্রকল্প। সব কি বোঝার ক্ষমতা আছে আমার?’
‘আছে। অবশ্যই আছে। চাই কেবল পাঠে মগ্নতা, লেগে থাকা!’
‘এই যে, বড়দের মতো উপদেশ দেওয়া শুরু করলে! আসল কথা বলছ না।’
“আসল কথা বলে ফেলেছি। ‘ফাইয়াজ’ অর্থ প্রচুর, যে প্রচুর দান করে। সে বা তাঁরা কি তোমাদের জন্য দেশটাকে নতুন করে সংস্কারের সুযোগ করে দেয়নি? উপহার দেয়নি? এর চেয়ে বড় দান আর কী হতে পারে? প্রশ্ন করেছিলাম একবার। মনে পড়ছে?”
‘তুমি তুমিই। তোমার কথায় ফারহানকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পেরে আমি ধন্য। ধন্য।’
বন্ধের দিনেও ফারহান গেট দিয়ে একটা কালো প্রাডো ঢুকছে কলেজের ভেতর। এই মুহূর্তে আলোময় ভাবনার মধ্যে কালোর উপস্থিতি আপন ঘোরমগ্নতা কাটিয়ে দিল। আর দেখল অটোচালক একপাশে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক চোখে দেখছে ওকে।
‘আপা, আপনাকে অন্য রকম লাগছে। মনে হলো এই গেটটা দেখার জন্য এসেছেন। আর কিছু কি দেখবেন?’
‘কেবল গেট দেখিনি। গেটের ভেতর আরও কিছু দেখেছি।’
‘জি। বুঝতে পারছি। আপনার সহযোদ্ধাকে দেখার চেষ্টা করেছেন। খোঁজার চেষ্টা করছেন।’
মুগ্ধ হয়ে গলার স্বর নরম করে সে বলল, ‘আমার নাম পুষ্প। আপনি আমার সিনিয়র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও। আপনি নয়, নাম ধরেই কথা বলতে পারেন।’
এ কথার জবাব না দিয়ে চালক বলল, ‘আমার নাম তূর্য। তবে আপনাকে আমি নাম ধরে ডাকতে পারব না। অপনি ছাত্র-আন্দোলনের একজন যোদ্ধা। সে হিসেবে আপনি সিনিয়র। অনেক বড় ও মহান।’
‘শোনেন, এভাবে বলবেন না। আপনারা, অটো এবং রিকশাচালকরাও আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন। আমরা সবাই সমান। কেউ সম্মান নিতে চাইনি। সম্মান বা নেতা হওয়ার জন্য রাস্তায় নামিনি। তবে যারা মূল সমন্বয়ক তাদের কথা আলাদা। যাদের ডিবি অফিসে নিয়ে টর্চার করেছে, যাদের ভয়ভীতি আর প্রলোভন দেখিয়ে টলাতে পারেনি, ভাঙতে পারেনি তাদের গুরুত্ব আলাদা। আলাদাভাবে তারা সম্মানিত হবে। যদি এই বিপ্লব ব্যর্থ হয়, হবে না, হলে তাদের জীবনও বিপন্ন হবে। এত সব বিপন্নতা মাথায় নিয়ে যারা ছাত্র-জনতাকে সংঘবদ্ধ করতে পেরেছে তাঁদের কুর্নিশ করতেই হবে।’
তূর্যও অবাক হয়ে গেল। এত বলিষ্ঠভাবে সত্যকথন শুনে বলল, ‘তবে যে প্রশ্ন উঠছে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-আন্দোলনের আড়ালে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিল, মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচার সরকার হটানো?’
‘একপক্ষ সে কথা বলছে। বলে বেড়াবে। ইতোমধ্যে আমরা ইতিহাস থেকেও জেনে গেছি যারা জয়ী হয়, মেধাবী পরিকল্পনার মাধ্যমেই জয়ী হয়। আর যারা পরাজিত হয়, বলে বেড়ায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে তারা।’ বলতে বলতে পুষ্পর মুখের কোমল পেশি কঠিন হয়ে গেল।
সড়কে চলমান গাড়ির একটা হর্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘ওই যে গেট দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরের বড় মাঠ। এখানে ফারহান খেলাধুলা করত। শুনেছি সে ছিল দুরন্ত খেলোয়াড়। পাড়াশোনায়ও ছিল দুরন্ত। এই কলেজের প্রায় সব ক্লাবের নেতৃত্বে ছিল। সায়েন্স ক্লাব, ম্যাথ ক্লাব, ল্যাঙ্গুঁয়েজ ক্লাব ছিল তার প্রাণের প্রাণ। ইংলিশ ভার্সনের ছাত্র ছিল, ওর বন্ধু মীর আয়াত আকরাজ চৌধুরী জানিয়েছে ফিজিক্সের জিআরই বই টেবিলে থাকত। কোয়ান্টাম মেকানিকসের বইও।’
‘ঠিক। আমিও শুনেছি।’
‘ভেতরে ঢোকা যাবে? মাঠটা দেখা যাবে? ওখানে একটু ঘুরে বেড়ানো যাবে?’
‘ঠিক জানি না, ঢুকতে দেবে কি না। তবে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারব।’ বলেই এগিয়ে গেল তূর্য।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে মলিন মুখে জানাল, ‘না। ভেতরে যেতে দেবে না। আজ বন্ধের দিন তো!’
‘পকেট-গেট দিয়ে কি ভেতরের বিশাল মাঠটা প্রাণ ভরে দেখা যাবে?’
তূর্য বলল, ‘আসুন, দেখা যাক ওরা বাধা দেয় কি না।’
পকেট-গেটের পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গার্ড ছুটে এসে বলল, ‘ভেতরে ঢুকবেন না।’
পুষ্প বলল, ‘না। ভেতরে না। এ ছোট গেটের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে বাইরে থেকেই দেখব ভেতরটা।’
বাধা দিল না গার্ড।
উঁকি দিয়ে ভেতরে তাকাল পুষ্প। যেন ভেতরে দেখতে পাচ্ছে একদল ছেলে ছুটোছুটি করছে। তার মধ্যে চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে ফারহান। মেধাবী ফারহান শুধু পড়াশোনায় নয়, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বহু পুরস্কার জিতেছে। সে ছিল অলরাউন্ডার। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মুনজেরিন শহিদেরও ছাত্র সে। তার হাত থেকে এক প্রতিযোগিতায় ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজয়ের মুকুট। সেই মুকুট মাথায় নিয়ে যেন সে ছুটে আসছে গেটের দিকে। যেন ছুটছে পুষ্পর উদ্দেশে, যেন ছুটছে দেশের নতুন আলোর দিকে, যেন ছুটছে আইমান সাদিক আর মুনজেরিনের উদ্দেশে। গণহত্যার সময় এ দম্পতিও রুখে দাঁড়িয়েছিল অকুতোভয় সাহস নিয়ে।
‘আপা, দেখা হলো?’
‘হয়েছে। তবে আরও দেখতে ইচ্ছে করছে।’
‘বুঝেছি আপনি বেশি ইমোশনাল হয়ে গেছেন। আপা, ইমোশন সামলে চলতে হয়। আসুন আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিই।’
এই কথার পিঠে কোনো কথা বলতে পারল না পুষ্প। কেমন যেন ছলছল করে উঠল চোখ। তারপর গেটের মূল স্তম্ভের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তূর্য বলল, ফারহানও ইতিহাসে অমর হবে! আসাদের মতোই মর্যাদা পাবে। আমরা অবশ্যই তাঁকে স্মরণে রাখব। কেবল পকেট-গেট দিয়ে নয়, জীবনের বড়ো-গেট দিয়েই ইতিহাসের চোখ তাঁকে দেখতে থাকবে। দেখতে হয়।