বাতাসে মুকুলের গন্ধ ম্লান হয়ে এসেছে। মহুয়া সেজেছে নতুন পাতায়। কাঠগোলাপের মিষ্টি সুবাসে অন্তহীন প্রান্তরে ফুটেছে বুনো শ্বেত রঙ্গন। ইন্দোচীন থেকে শুরু করে উপমহাদেশ অপেক্ষা করছে, বর্ষবরণের। তবে, বর্ষবরণ যে এখন শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয় বরং ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে রাজনীতির কোমল অস্ত্র এবং দিকহারা মধ্যবিত্তের লোক দেখানো মহোৎসব। মহাজনেরা হয়েছে কর্পোরেট বস, ডাকাতি করে নিয়েছে বৈশাখী অনুষ্ঠান। আর বাকি যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা ক্লেশে।
পুরোনো শাস্ত্রে বাংলাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে ব্রাত্যদের দেশ হিসেবে। অর্থাৎ জগত জোড়া সকল জাত হারা লোকেরা কী এক সুখের আশায় শত নদীর তীরে যেন নীড় বেঁধেছে। তাই এরা পরে বার্মিজ পোশাক, খায় তুর্কি-মধ্যেশীয় খাবার, বিশ্বাস করে, যা খুশি সাধ। এটা নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না। কারণ বাংলায় আমার বয়স বোধ করি, গড়ে দেড়শ বছর। জাত হারিয়ে আমি এখন গর্ব করেই বাঙালী এবং বাংলা ভাষা আমার মাতৃদুগ্ধ।
আমার বৈশাখ ঢাকাই মধ্যবিত্তের নয়। বৈশাখ মানে আমার কাছে ঘরে ওঠা বৈশাখী ধানের খই ভাজার ধুম, বটতলার মেলা, লোকগানের আসর, ভাল মন্দ খাওয়া, একটু যদি নতুন পোশাক! শুধু কী বৈশাখী মেলা? চড়ক পূজার মেলা, মোরগ লড়াই, বলি খেলা, হরেক পদের প্রাণবন্ত উদযাপন।
একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছে শিরোনাম। জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি মন্ত্রীর মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রীতি। শিরোনাম পড়ে আমি একটু খুশিই হয়েছিলাম। আবার মনটা একটু খারাপই হয়েছিল, বেচারা মন্ত্রীর অবস্থান এত নড়বড়ে ভেবে। সংস্কৃতির মত স্বকীয় বিষয় নিয়েও মাথা ঘামাতে হয় মন্ত্রকের। বছরে বছরে পরিবর্তিত হয় আয়োজনের নাম। আসলে ঢাকার পহেলা বৈশাখ মানে রমনার বটমূল, চারুকলার শোভাযাত্রা, রবীন্দ্র সরোবরে গগণবিদারী আর্তনাদ। ভাসমান হোটেলে হানকি ভরে পান্তা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ঢাকাবাসী আনন্দিত হয় এই ভেবে যে, আর যাই হোক কালচারটা সে ধরতে পেরেছে। ঘরে ফিরে ভাবে এই তো বাঙালির বৈশাখ। কিন্তু সে বৈশাখ আসতো মহাজনদের ঘরে আর কৃষকদের ঘামে।
এই যে পহেলা বৈশাখ নিয়ে ঢাকাবাসীর এত নকল আগ্রহ, তার একটা কারণ হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে লোক দেখানোর আইকনিক মাস্টারপ্ল্যান হিসেবে। অথবা নিজেদের কালচারকে আগোরাতে তুলে দরদাম। যেমনটা বৃটিশ আমলে, কলিকাতার বাবু সমাজ করেছিল শারদীয়া নিয়ে। যত হোক দুই দেশ, গর্ভাশয় একটাই। পূবেরটা আবার এদিক থেকে অনেক এগিয়ে।
আমার মনে হয়, ঢাকাবাসী মধ্যবিত্তের উত্থান হলে, তারা করজোড়ে রাত্তিরে ভাবতো কোন অনুষ্ঠানটিকে আইকনিক অনুষ্ঠানের রূপ দেওয়া যায়। যেখানে একটু আগাগোড়া বাঙালি সেজে নিম্নবিত্তের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ঠাট্টা করা যাবে। তাই তারা বেছে নিল এই উৎসবটিকে। পহেলা বৈশাখকে কোনোভাবে জীবন্ত সত্তা ঘোষনা করা হোক। তারপর দেখা যাবে, বৈশাখের আসল রূপ।
আমার বৈশাখ ঢাকাই মধ্যবিত্তের নয়। বৈশাখ মানে আমার কাছে ঘরে ওঠা বৈশাখী ধানের খই ভাজার ধুম, বটতলার মেলা, লোকগানের আসর, ভাল মন্দ খাওয়া, একটু যদি নতুন পোশাক! শুধু কী বৈশাখী মেলা? চড়ক পূজার মেলা, মোরগ লড়াই, বলি খেলা, হরেক পদের প্রাণবন্ত উদযাপন। তবে সেসবের অনেকটাই এখন অতীত। মেলা এবং গানের আসর নিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণীর গাত্রদাহ লক্ষনীয়। দিন দিন এর প্রকোপ বাড়ছেই। বাকিটা কোম্পানির স্পন্সরে ব্যন্ড সংগীত। আসলে ধর্মান্ধ লোকেদের কাছে পৃথিবীর সকল কিছুই অনুচিত এবং অপালনীয়। আর অগিকালচারের কাছে বাঙালির সেকেলে কালচার। কারণ, মানুষের মনে হীনমন্যতা যত বেশি, অস্পষ্টতা যত বেশি তার কাছে দুনিয়ার অনেক কিছুই একে একে নেতিবাচক প্রমাণিত হতে থাকে। যে লোক সাপ চেনে সে আর যাই হোক নির্বিষ সাপকে রোদ পোহানোর অপরাধে হত্যা করে বসে না। যেমন কিছুদিন আগেই কুষ্টিয়ায় গঞ্জঘুরে ঘোষনা করা হয়েছে গান বাজনা হলে কবরের মাটি মিলবে না। অধিকার হারাবে উপাসনালয়েও। গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়েছে শতাধিক ঐতিহ্যবাহী মেলা। এর দায়, জাতে উঠতে চাওয়া কীট সমাজের। সন্দেহ নেই।
আসলে সংস্কৃতি চলমান। জীবনযাত্রার সাথে একে মানিয়ে নিতে হয়। তাই একই উৎসব শত বছরের চেহারা পাল্টায় কমে পাঁচবার। ( বাংলাদেশে একশো বার) ঢাকাই মধ্যবিত্ত যতই করুক মহোৎসব, যতই মাতুক নকল আনন্দে, সে কখনোই পাবে না, নিম্নবিত্তের উদযাপনের স্বাদ। সে হয়তো নিম্নবিত্তের মুখের খাবার, বড়জোর পোশাকটা নিতে পারবে। ঐ আমেজ, ঐ আগ্রহ কেবল নিম্নবিত্তের কাছেই ছিল, আছে এবং থাকবে। আমি কোনো শ্রেণির উদযাপনকে ছোট করতে চাই না। সে অধিকার আমার নেই। কিন্তু রং মেখে সং সাজলে তাকে সংই বলে। আমি কেবলই আমার উত্তরসূরীদের জানিয়ে রাখতে চাই, যে উৎসব নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, কর্পোরেট অফিস এবং শিক্ষার্থী সংসদ উদ্বিগ্ন, সে উৎসবটির পুরোটাই মেকী এবং কেবলই হতে চাওয়া। জোর করে হওয়া। আসলে আমাদের পহেলা বৈশাখ চুরি হয়ে গেছে।


