বৈশাখের একগুচ্ছ কবিতা

 

বৈশাখের কবিতা


ফসলের স্বপ্ন-গণিত

সাদমান সাকিল



স্বতন্ত্র সহজাত এক সকালে শুনি

সূর্যমথিত ফসলের নিহিলিস্ট ডাক।

ঘাঘটের অসর্পিলতায় মুগ্ধ থেকে 

কবিতার একটি পঙ্গু পঙক্তিকে

দারুণ অর্বাচীনতায় ভালোবেসে ফেলি।


অন্তর্গত কোলাহলে রুগ্ন হয়ে থাকি;

চরম বিস্ময়ে চিবুই নিজের ফসিল।

তবুও চোখ রাখি ফসলের অব্যর্থ চোখে

বৈশাখের তীব্রতম দুপুরে পড়ি ধানের উপপাদ্য। 


শরীরের নির্বিঘ্ন জ্যামিতিতে খুঁজি— মুক্তি।

অস্তিত্বের নিদারুণ যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে

যখন অকস্মাৎ আফ্রোদিতি'র দেখা পাই

তখন, ফ্রয়েডকে মনে হয় নিজের এন্টি-থিসিস।


নীরবতাকে পরম মহাজাগতিক ধ্রুবক ধরে—

ফসলের স্বপ্ন-গণিতের সমাধান খুঁজি।

মানসিক ক্যানভাসে চলে দ্বান্দ্বিক কারুকাজ-

আফ্রোদিতি'র সাথে তীব্রতম সংঘাতে নামে শক্তিময়ী লিলিথ।







পুতুল

স্বাধীন রহমান 


পুতুল বেচেছিলাম একদিন।

কোন এক বৈশাখের উত্তপ্ত দুপুর শেষে, উষ্ণ বিকেলে,

কত রঙ-বেরঙের পুতুল।

মাটির উপর কত প্রলেপের পর,

এক ঝুড়িতে করে নিয়ে গিয়েছিলাম হাঁটে,

বৈশাখের পহেলা বিকেলে।

কত রঙ, বেরঙের পুতুল,

কী অদ্ভুত! আরো কত পুতুল,

রঙ-বেরঙের পুতুল কিনে নিল,

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, 

পুতুলগুলো পুতুল নিয়ে,

হাঁসি মাখা মুখে, বৈশাখের এই উত্তপ্ত দুপুর শেষে, 

উষ্ণ বিকেলে, এক সুতোর টানে ঘুরে ফিরে।






পান্তাভাত 

কাঁকন জামান


হে সিন্ধু! তোর পলিমাটি-জলে 

কে রেখে গেল প্রথম পান্তার স্বাদ?

কোন্ কৃষক অদৃশ্য আঙুলে লিখে গেল 

অম্ল-ইতিহাসের গল্প? 

সেই আদি কৃষক কি জেনে গিয়েছিল

ধান-ভেজা জলের রহস্য?

মাটির হাঁড়িতে লুকিয়ে থাকা

প্রথম গাঁজন-গাথার সুর...


মহেঞ্জোদারোর রান্নাঘরে 

একটি চুলাহিতে ধান ভেজে 

কোন্ রমণী আবিষ্কার করেছিল

এই সহজ পানীয়ের মাহাত্ম্য?

হরপ্পার স্নানাগারে পড়ে থাকা

ধান-ভেজা জলের গন্ধ

আজও ডাকে আমাকে...


বৈদিক যুগে ঋষিরা ডাকতেন 

কাঞ্জিকা নামে,

আয়ুর্বেদে চরক লিখে গেছেন

এর ঔষধি গুণ।

সামবেদের স্তোত্রে স্তোত্রে

ঝিলমিলিয়ে ওঠে

পান্তার জ্যোৎস্না...


পাল রাজাদের আমলে 

বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিয়ে গেলেন

পান্তার সরল পথ...

মুঘল সেনাদের রসদে

লুকিয়ে থাকা এই শক্তি

আইন-ই-আকবরীতে লেখা হয়নি...


আজ রমনা বটমূলে 

পহেলা বৈশাখের সকালে

ইলিশের পাতে পান্তা

হয়েছে বাঙালির প্রাণ...

কোন কবি লিখবে

এই গাঁজন-গাথার মহাকাব্য?


হে সময়! থামো তুমি, একটু থামো...

এই মাটির পাত্রে মুখ ডুবিয়ে

আমি পান করি

পাঁচ সহস্রাব্দের ইতিহাস

এক চুমুকে!






নববর্ষের গান

 এম আর মাহফুজ  


নতুন বছর নতুন দিন

বাজলো মনে খুশির বিন

জুড়িয়ে দিলো প্রাণ। 

চারিদিকে উঠলো বেজে

নববর্ষের গান! 


ফুল কাননে ফুলের মেলা

ভ্রমর উড়ে করছে খেলা

পাখির কলতান। 

চারিদিকে উঠলো বেজে 

নববর্ষের গান! 


বিহঙ্গ সব যাচ্ছে উড়ে

মিষ্টি মধুর গানের সুরে

মন করে আনচান। 

চারিদিকে উঠলো বেজে 

নববর্ষের গান! 







বোশেখের ডাক

 রাসেল হোসেন 


বোশেখ ডাকে ঢাকের বুকে অঙ্গে বাউলা গান,


রৌদ্র মেখে জাগায় আবার ঘুমিয়ে-পড়া প্রাণ।

মেলার হাঁটে রঙের ঢেউয়ে ভাসে সোনার দেশ,

খেলার মাঠে পথে ঘাটে রয় না দুঃখের লেশ।

হালখাতার পাতা দেখে ডেকে বলে সওদাগর 


জিলাপিটা মুখে পুরে নতুন করে সওদা কর।

মাটির হাঁড়ি,রঙিন পুতুল, বাঁশির ডাকে মুগ্ধ পথ,

শৈশব যেন বোশেখমাখা স্মৃতিকাতর আনন্দ রথ।

কাঁচা আম আর লবণ মরিচ গাছের ডালে রাখা

ধানের ক্ষেতে চড়ুই শালিক দোলায় তাদের পাখা

গ্রামবাংলার আকাশজুড়ে উৎসবের নেই সীমা


জাতি ধর্মের বিভেদ ঘোচায় বঙ্গের শ্যামলিমা।




ধন্যবাদ.....



 


Previous Post Next Post