পাঠাগারের চব্বিশটা সিঁড়ি এবং একজন পাঠকের গল্প


 

পাঠাগারের সিঁড়ি সর্বমোট চব্বিশটা। সাধারণ মানুষের তিরিশ সেকেন্ড লাগে উঠতে। কিন্তু তুর্জ সেটা পারে না। ওর লাগে কয়েক মিনিট।


তবুও তুর্জ পাঠাগারে আসে। পাঠাগারে এসে বই নিয়ে গল্প করা, কথা বলা এগুলো ওর নিয়মিত অভ্যাস। পাঠাগারে এসে নিজের নামে নিয়ম করে বই এন্ট্রি করে নিয়েও যায়। 


তুর্জ; বয়স মাত্র সাত বছর, তবুও জ্ঞান গভীরতায় বুড়োওয়ালা চাকরিজীবীদের থেকেও ঢের বেশি। কারণটা অবশ্য জানা, সে প্রচুর পড়ে। আনন্দ, তৃপ্তি নিয়ে বই পড়ে। প্রশ্ন করে। প্রশ্ন করতে হলেও কিছু জানতে হয়, এটা অনেকে বিশ্বাস করে না, সে করে, জানে, যথোপযুক্ত প্রশ্নও করে। বয়সের কারণে কিছু বিষয় হয়তো সে বোঝে না, তবে সেটা অতি শীঘ্রই বুঝতে শিখবে। কারণ সে বই পড়ে।


তুর্জ শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন। অসীম মনের জোর তার। পাঠাগারে উঠতে তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কোনো একটা বই পড়লে বইয়ের প্রভাব অনেক দিন পর্যন্ত থাকে ওর। ঠিক সে কারণেই তুর্জর মনে হলো, মনের জোরে সে নিশ্চয়ই এবার একাই উঠতে পারবে। হয়তো পারতো, দিনটি বোধহয় শুভ ছিল না। সেই সিঁড়িতেই পড়ে গেল। শুধু তাই নয়, গুরুতর আহত সে। মাথা ফেটে পাঠাগারের সিঁড়ি রক্তাক্ত।


এক মাস তুর্জ হাসপাতালে ছিল। সবার ধারণা, তার পরিবার কিংবা সে নিজেই আর উঠবে না পাঠাগারে। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে প্রথমবার সে একাই চব্বিশটি সিঁড়ি অতিক্রম করে, দশ মিনিট সময় নিয়ে চব্বিশটি সিঁড়ি অতিক্রম করে পাঠাগারে উঠেছে।


এখানে চব্বিশটা সিঁড়ি বা দশ মিনিট কোনটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে বইয়ের টানে একটা অসুস্থ ছোট্ট শিশুকে চব্বিশটা সিঁড়ি ওঠার অদম্য শক্তি দিল, অথচ সাধারণ সুস্থ মানুষকে কেন দেয় না, তা আমার জানা নেই।


অথবা আমরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বই পড়ি না, অজুহাত খুঁজি।


লেখা: মৌমিতা তাসনীম পারি


Previous Post Next Post